ইতালি নন সিজনাল ভিসা। বেতন, খরচ, কাজ ও আবেদন
ইউরোপের স্বপ্নের দেশ ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাস আর ভালো উপার্জনের স্বপ্ন দেখেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের ভাই-বোনদের কাছে ইতালি সবসময়ই পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে। আপনি যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য সেখানে থাকতে চান এবং পরিবার নিয়ে থিতু হতে চান, তবে ইতালি নন সিজনাল ভিসা আপনার জন্য সেরা সুযোগ।
ইতালি নন সিজনাল ভিসা কি?
সহজ কথায় বলতে গেলে, ইতালি নন সিজনাল ভিসা হলো এমন একটি অনুমতিপত্র যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদে সেখানে কাজ করার সুযোগ দেয়। সিজনাল ভিসা যেমন নির্দিষ্ট কয়েক মাসের জন্য হয়, এটি তেমন নয়। এই ভিসার মাধ্যমে আপনি ইতালিতে বছরের পর বছর থাকতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী বসবাসের আবেদনও করতে পারবেন।
ইতালি নন সিজনাল ভিসার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর স্থায়িত্ব। আপনি একবার এই ভিসা পেয়ে গেলে প্রতি বছর নবায়ন করার ঝামেলা অনেক কম থাকে। এছাড়া এটি আপনাকে ইতালির মূলধারার শ্রমবাজারের সাথে যুক্ত করে দেয়।
ইতালি নন সিজনাল ভিসার প্রকারভেদ
ইতালি নন সিজনাল ভিসার মধ্যে বেশ কিছু বিভাগ রয়েছে যা আপনার কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘সাবঅর্ডিনেট ওয়ার্ক ভিসা’ বা বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে কাজ করার ভিসা। আপনি যদি ইতালির কোনো কোম্পানির অধীনে কাজ করতে চান, তবে এটি আপনার জন্য।
দ্বিতীয়ত রয়েছে ‘সেলফ-এমপ্লয়মেন্ট ভিসা’ বা স্ব-কর্মসংস্থান ভিসা। আপনি যদি সেখানে গিয়ে নিজের কোনো ব্যবসা শুরু করতে চান বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করতে চান, তবে এই ক্যাটাগরি বেছে নিতে পারেন। এটি উদ্যোক্তাদের জন্য দারুণ একটি সুযোগ।
এছাড়া রয়েছে ‘হাইলি কোয়ালিফাইড ওয়ার্কার্স’ বা ব্লু কার্ড। আপনি যদি বিশেষ কোনো কারিগরি দক্ষতা বা উচ্চতর ডিগ্রিধারী হন, তবে এই ভিসায় খুব দ্রুত ইতালি যাওয়ার সুযোগ থাকে। এটি মূলত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আইটি বিশেষজ্ঞদের জন্য বেশি প্রযোজ্য।
ইতালিতে নন সিজনাল ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
ইতালি নন সিজনাল ভিসা আবেদন করার আগে আপনার সব নথিপত্র গুছিয়ে রাখা জরুরি। প্রথমেই আপনার একটি বৈধ পাসপোর্ট লাগবে যার মেয়াদ অন্তত দুই বছর থাকা ভালো। পাসপোর্টের পাশাপাশি আপনার সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবিও প্রয়োজন হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হলো ইতালির নিয়োগকর্তার কাছ থেকে পাওয়া ‘Nulla Osta’ বা অনাপত্তি পত্র। এই কাগজটি ছাড়া আপনি ভিসার আবেদন করতে পারবেন না। আপনার নিয়োগকর্তা ইতালির স্থানীয় ইমিগ্রেশন অফিস থেকে এটি সংগ্রহ করে আপনাকে পাঠাবেন।
আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট এবং কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণপত্রও সাথে রাখতে হবে। এছাড়া আপনার নামে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, তার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে রাখা বাধ্যতামূলক। এই কাগজগুলো অবশ্যই যথাযথভাবে অনুবাদ এবং নোটারি করা থাকতে হবে।
ইতালি নন সিজনাল ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া
ইতালি নন সিজনাল ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ার শুরুটা হয় ইতালির ভেতর থেকে। আপনার নিয়োগকর্তা প্রথমে ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে আপনার জন্য কাজ করার অনুমতি চাইবেন। তারা সব যাচাই-বাছাই করে আপনার জন্য ‘নুলা ওস্তা’ ইস্যু করবে।
নুলা ওস্তা হাতে পাওয়ার পর আপনার কাজ শুরু হবে বাংলাদেশে। আপনি ইতালিয়ান দূতাবাসের নির্ধারিত এজেন্সির মাধ্যমে ভিসার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ভিএফএস গ্লোবাল (VFS Global) এই কাজগুলো পরিচালনা করে থাকে।
আবেদনের দিন আপনাকে সব অরিজিনাল কাগজপত্র এবং ফটোকপি নিয়ে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে আপনার বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে। এরপর দূতাবাস আপনার ফাইলটি পরীক্ষা করবে এবং সব ঠিক থাকলে আপনাকে ভিসার জন্য ডাকবে।
ইতালি নন সিজনাল ভিসা খরচ
ইতালি নন সিজনাল ভিসায় সেখানে যাওয়ার খরচ অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। সরকারি ফি ছাড়াও এজেন্সি ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ থাকে। নিচে একটি সম্ভাব্য খরচের তালিকা দেওয়া হলোঃ
| খরচের খাত | আনুমানিক পরিমাণ (টাকা) |
|---|---|
| ভিসা প্রসেসিং ফি (সরকারি) | ১৫,০০০ – ২০,০০০ টাকা |
| ভিএফএস সার্ভিস চার্জ | ৫,০০০ – ৭,০০০ টাকা |
| মেডিকেল ও ইনস্যুরেন্স | ১০,০০০ – ১৫,০০০ টাকা |
| বিমান টিকিট | ৮০,০০০ – ১,২০,০০০ টাকা |
| এজেন্সি বা কনসালটেন্সি ফি | কাজের ধরন ভেদে ভিন্ন হয় |
মনে রাখবেন, এই খরচগুলো পরিবর্তনশীল। দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করলে আপনি অনেক টাকা বাঁচাতে পারবেন।
ইতালি নন সিজনাল ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা
ইতালি নন সিজনাল ভিসা পেতে হলে আপনার বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। তবে সাধারণত ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আপনার শারীরিক সুস্থতাও এখানে একটি বড় বিষয়, কারণ বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করার সক্ষমতা থাকতে হয়।
আপনার অন্তত ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা (এসএসসি বা সমমান) থাকা ভালো। তবে কারিগরি কাজে দক্ষতা থাকলে পড়াশোনা কিছুটা কম হলেও সমস্যা হয় না। যেমন—আপনি যদি ভালো ওয়েল্ডিং, ড্রাইভিং বা ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ জানেন, তবে আপনার সুযোগ বেড়ে যাবে।
ইতালিয়ান ভাষা জানাটা বাধ্যতামূলক না হলেও এটি আপনার জন্য বোনাস। আপনি যদি প্রাথমিক ইতালিয়ান ভাষা বলতে পারেন, তবে আপনার ইন্টারভিউ যেমন সহজ হবে, তেমনি সেখানে গিয়ে কাজ পেতেও সুবিধা হবে। স্থানীয় ভাষা জানলে আপনি অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবেন।
ইতালি নন সিজনাল ভিসা ইন্টারভিউ প্রস্তুতি
ইন্টারভিউয়ের সময় আত্মবিশ্বাসী থাকা সবচেয়ে জরুরি। আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হতে পারে আপনি ইতালিতে কেন যেতে চান। এর উত্তরে আপনার কাজের প্রতি আগ্রহ এবং ইতালির সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলতে পারেন।
আপনার নিয়োগকর্তা এবং আপনার কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে রাখুন। আপনি ইতালিতে কোথায় থাকবেন এবং আপনার বেতন কত হবে—এসব প্রশ্ন প্রায়ই করা হয়। উত্তর দেওয়ার সময় সত্য এবং নির্ভুল তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
পোশাক-আশাকের দিকে নজর দিন। খুব বেশি ফরমাল হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরিচ্ছন্ন এবং মার্জিত পোশাক পরুন। কথা বলার সময় সরাসরি অফিসারের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন, এতে আপনার সততা প্রকাশ পায়।
ইতালি নন সিজনাল ভিসায় কাজ ও বেতন
ইতালিতে নন সিজনাল ভিসায় বিভিন্ন খাতে কাজের সুযোগ রয়েছে। বেতনের পরিমাণ নির্ভর করে আপনার অভিজ্ঞতা এবং কাজের ধরনের ওপর। নিচে একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া হলোঃ
| কাজের ধরন | মাসিক আনুমানিক বেতন (ইউরো) | আনুমানিক টাকা (বিডিটি) |
|---|---|---|
| রেস্টুরেন্ট বা হোটেল স্টাফ | ১,২০০ – ১,৫০০ ইউরো | ১,৫০,০০০ – ১,৯০,০০০ টাকা |
| নির্মাণ শ্রমিক (কনস্ট্রাকশন) | ১,৪০০ – ১,৮০০ ইউরো | ১,৮০,০০০ – ২,৩০,০০০ টাকা |
| কৃষি বা খামার কর্মী | ১,১০০ – ১,৩০০ ইউরো | ১,৪০,০০০ – ১,৭০,০০০ টাকা |
| ড্রাইভিং (ভারী যানবাহন) | ১,৬০০ – ২,২০০ ইউরো | ২,০০,০০০ – ২,৮০,০০০ টাকা |
ইতালিতে ওভারটাইম করার সুযোগ থাকে। আপনি যদি মূল ডিউটির বাইরে বাড়তি সময় কাজ করেন, তবে আপনার আয় আরও অনেক বাড়বে। তবে মনে রাখবেন, ইতালিতে ট্যাক্স কাটার পর আপনি এই বেতন হাতে পাবেন।
ইতালি ভিসা আবেদন করার ওয়েবসাইট
ভিসার জন্য সঠিক তথ্য পাওয়া খুব জরুরি। ভুল ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রতারিত হবেন না। ইতালির ভিসা সংক্রান্ত সব তথ্যের জন্য আপনি নিচের ওয়েবসাইটগুলো অনুসরণ করতে পারেনঃ
১। VFS Global Bangladesh: এটি বাংলাদেশে ইতালির অফিশিয়াল ভিসা পার্টনার। অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং ফাইল জমা দেওয়ার জন্য (https://visa.vfsglobal.com/bgd/bn/ita) এই সাইটটি ব্যবহার করুন।
২। Italian Ministry of Foreign Affairs: ভিসার ধরন এবং নিয়মাবলী জানতে (https://esteri.it) সাইটটি ভিজিট করতে পারেন। এটি ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল পোর্টাল।
৩। Polizia di Stato: ইতালির ইমিগ্রেশন এবং নুলা ওস্তা সংক্রান্ত খবরের জন্য এই সাইটটি বেশ কার্যকর। সবসময় চেষ্টা করবেন অফিশিয়াল সোর্স থেকে তথ্য যাচাই করে নিতে।
ইতালি নন সিজনাল ভিসায় বসবাস করার খরচ
বিদেশে শুধু আয় করলেই হয় না, ব্যয়ের হিসাবটাও মাথায় রাখতে হয়। ইতালির বড় শহরগুলোতে থাকার খরচ একটু বেশি হলেও ছোট শহরগুলোতে বেশ সাশ্রয়ীভাবে থাকা যায়। নিচে মাসিক ব্যয়ের একটি খসড়া দেওয়া হলোঃ
| ব্যয়ের খাত | আনুমানিক খরচ (ইউরো) |
|---|---|
| বাসা ভাড়া (শেয়ারিং) | ২৫০ – ৪০০ ইউরো |
| খাবার খরচ | ১৫০ – ২০০ ইউরো |
| যাতায়াত (বাস বা ট্রেন) | ৪০ – ৬০ ইউরো |
| মোবাইল ও ইন্টারনেট | ২০ – ৩০ ইউরো |
| অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ | ৫০ – ১০০ ইউরো |
আপনি যদি একটু হিসেবি হন, তবে মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ ইউরোর মধ্যে খুব সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন। বাকি টাকা আপনি অনায়াসেই দেশে পরিবারের কাছে পাঠাতে পারবেন। অনেকে মিলে একসাথে থাকলে খরচ আরও অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
ইতালির ভিসা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক খবর
সম্প্রতি ইতালি সরকার তাদের শ্রমবাজারের ঘাটতি মেটাতে ‘ফ্লুসি ডিক্রি’ বা স্পনসরশিপ আইনের আওতায় প্রচুর কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের জন্য তারা নন সিজনাল ভিসার কোটা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। এটি আমাদের দেশের দক্ষ কর্মীদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ।
আরেকটি বড় খবর হলো, এখন থেকে আবেদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল সিস্টেম আরও উন্নত করা হয়েছে। ভুয়া নুলা ওস্তা বা জাল কাগজপত্রের বিরুদ্ধে ইতালি সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাই সব সময় বৈধ পথে এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ইতালির ভিসার চাহিদা প্রচুর থাকায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে ধৈর্য ধরে সঠিক নিয়মে এগোলে আপনার ইতালির স্বপ্ন সত্যি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। নিয়মিত দূতাবাসের ওয়েবসাইট চেক করুন এবং নতুন কোনো আপডেট আসলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।
আরো জানুনঃ






