ম্যারেজ ভিসা।খরচ,যোগ্যতা,কাগজপত্র ও আবেদন
আপনি কি আপনার জীবন সঙ্গীর সাথে নতুন জীবন শুরু করতে চান? তাহলে ম্যারেজ ভিসা হতে পারে আপনার সঠিক মাধ্যম। এই পোস্টে, ম্যারেজ ভিসা কি, যোগ্যতা কি কি, কাগজপত্র, আবেদন করার নিয়ম সহ বিস্তারিত সব তথ্য জানতে পারবেন।
ম্যারেজ ভিসা কি?
ম্যারেজ ভিসা হলো এমন একটি ভিসা, যা কোনো ব্যক্তি তার বিদেশি জীবন সঙ্গীকে নিজের দেশে নিয়ে আসার জন্য ব্যবহার করে থাকেন। এটি একটি দেশের নাগরিককে তার বিদেশি জীবন সঙ্গী/সঙ্গিনীর সাথে বসবাসের অনুমতি দেয়।
সহজ ভাষায়, আপনি যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিককে বিয়ে করেন এবং চান যে আপনার স্ত্রী বা স্বামী আপনার দেশে এসে আপনার সাথে থাকুক, তাহলে তার জন্য ম্যারেজ ভিসা প্রয়োজন হবে।
ম্যারেজ ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
ম্যারেজ ভিসার জন্য আবেদন করার সময় কিছু জরুরি কাগজপত্র লাগে। এইগুলো আপনার আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ করে তুলবে।
- আপনার এবং আপনার জীবন সঙ্গীর ভ্যালিড পাসপোর্ট থাকতে হবে।
- দু’জনের জন্ম সনদের প্রয়োজন হবে।
- অফিশিয়াল ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেখাতে হবে।
- দভিসা অফিসের দেওয়া আবেদনপত্রটি সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে।
- পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি দরকার হবে।
- আপনার সঙ্গীকে সাপোর্ট করার মতো যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ্য আছে, তা দেখাতে হবে। যেমন ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ট্যাক্স রিটার্ন ইত্যাদি।
- বসবাসের ঠিকানা এবং অন্যান্য যোগাযোগের তথ্য দিতে হবে।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট অর্থাৎ প্রমাণ করতে হবে যে আপনার জীবন সঙ্গীর কোনো প্রকার ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই।
- স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার জীবন সঙ্গী কোনো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত নন।
- প্রমাণ করতে হবে আপনার বিয়েটা সত্যি, কোনো অবৈধ উদ্দেশ্যে নয়। এক্ষেত্রে আপনারা একসঙ্গে ছবি, ভিডিও, অথবা অন্য কোনো ডকুমেন্ট দিতে পারেন।
ম্যারেজ ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া
ম্যারেজ ভিসার জন্য আবেদন করা একটু জটিল মনে হতে পারে, কিন্তু সঠিক গাইডলাইন জানা থাকলে এটা সহজ। চলুন, ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি জেনে নেই।
১। প্রথমে, যে দেশে যেতে চান, সেই দেশের ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইটে যান।
২। এরপর ম্যারেজ ভিসার জন্য আবেদনপত্রটি ডাউন-লোড করুন।
৩। আবেদনপত্রটি মনোযোগ দিয়ে পূরণ করুন। কোনো ভুল তথ্য দেবেন না।
৪। প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্টস, যেমন পাসপোর্ট, জন্ম সনদ, বিয়ের সার্টিফিকেট, আর্থিক প্রমাণের কাগজপত্র, এবং অন্যান্য যা যা চেয়েছে, সেগুলো গুছিয়ে নিন।
৫। আপনার এলাকার ভিসা অফিসে বা অ্যাম্বাসিতে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন।
৬। নির্দিষ্ট তারিখে আপনার সব ডকুমেন্টস নিয়ে ভিসা অফিসে যান।
৭। সেখানে ভিসা ফি জমা দিন এবং ইন্টারভিউয়ের জন্য প্রস্তুতি নিন।
৮। ইন্টারভিউতে আপনার সম্পর্ক এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হতে পারে।
৯। ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার পরে, আপনার ভিসার জন্য অপেক্ষা করুন।
১০। ভিসা পাওয়ার পরে, আপনার জীবন সঙ্গীকে আপনার দেশে নিয়ে আসতে পারবেন।
ম্যারেজ ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা
ম্যারেজ ভিসা পাওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা লাগে। এই যোগ্যতাগুলো পূরণ করতে পারলে আপনার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
- প্রথমত, আপনাকে অবশ্যই একজন বৈধ নাগরিক হতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, আপনার জীবন সঙ্গী/সঙ্গিনীর সাথে আপনার বৈধভাবে বিয়ে হতে হবে এবং এর প্রমাণ দেখাতে হবে।
- তৃতীয়ত, আপনার যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে, যাতে আপনি আপনার জীবন সঙ্গীকে সাপোর্ট করতে পারেন।
- চতুর্থত, আপনার কোনো প্রকার ক্রিমিনাল রেকর্ড থাকলে হবে না।
- পঞ্চমত, আপনার জীবন সঙ্গী/সঙ্গিনীর কোনো মারাত্মক রোগ থাকলে হবে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিভিন্ন দেশের ম্যারেজ ভিসা
বিভিন্ন দেশের ম্যারেজ ভিসার নিয়মকানুন ভিন্ন হতে পারে। নিচে কয়েকটি জনপ্রিয় দেশের ম্যারেজ ভিসা নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ
যুক্তরাজ্যে ম্যারেজ ভিসা
যুক্তরাজ্যে ম্যারেজ ভিসাকে স্পাউস ভিসা বলা হয়। এই ভিসার মাধ্যমে আপনি আপনার জীবন সঙ্গীকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যেতে পারবেন।
- আবেদনকারীকে ২১ বছরের বেশি হতে হবে।
- আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার সম্পর্কটি বৈধ এবং স্থায়ী।
- আবেদন করার সময় আপনার জীবন সঙ্গীর কমপক্ষে ১৮,৬০০ পাউন্ড বা ৩০,৭১,০০০ টাকা প্রায় আয় থাকতে হবে।
- ইংরেজিতে ভালো দক্ষতা থাকতে হবে।
ইউএসএ ম্যারেজ ভিসা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যারেজ ভিসাকে সাধারণত স্পাউসাল ভিসা ( স্পাউস ভিসা) বলা হয়।
- CR-1 ভিসাঃ এই ভিসা তাদের জন্য যারা বিয়ের দুই বছরের মধ্যে আবেদন করতে আগ্রহী।
- IR-1 ভিসাঃ যারা দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিবাহিত, তারা এই ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন।
এই ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে, মার্কিন নাগরিককে তার জীবন সঙ্গীর জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানের অঙ্গীকার করতে হয়।
কানাডা ম্যারেজ ভিসা
কানাডায় ম্যারেজ ভিসাকে স্পাউসাল স্পনসরশিপ বলা হয়।
- কানাডার নাগরিক অথবা স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- আপনার জীবন সঙ্গীকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার সামর্থ্য থাকতে হবে।
- আবেদন করার সময় আপনার কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড থাকলে হবে না।
অস্ট্রেলিয়া ম্যারেজ ভিসা
অস্ট্রেলিয়ায় ম্যারেজ ভিসাকে পার্টনার ভিসা বলা হয়।
- সাবক্লাস ৮২০: এটি একটি অস্থায়ী ভিসা, যা আবেদনকারীকে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করার অনুমতি দেয়।
- সাবক্লাস ৮০১: এটি একটি স্থায়ী ভিসা, যা সাধারণত সাবক্লাস ৮২০ ভিসার পরে দেওয়া হয়।
এই ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে, আপনার এবং আপনার সঙ্গীর সম্পর্কের প্রমাণ দিতে হবে।
ম্যারেজ ভিসা ইন্টারভিউ প্রস্তুতি
ম্যারেজ ভিসা ইন্টারভিউ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখানে কিছু টিপস দেওয়া হলো, যা আপনাকে প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবেঃ
- সাক্ষাৎকারের আগে আপনার সমস্ত কাগজপত্র ভালোভাবে গুছিয়ে নিন।
- আপনার সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখুন।
- সাক্ষাৎকার কক্ষে শান্ত থাকুন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিন।
- ভিসা অফিসারের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় সৎ থাকুন। কোনো ভুল তথ্য দেবেন না।
- আপনার এবং আপনার জীবন সঙ্গীর সম্পর্কে কিছু সাধারণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হতে পারে, যেমন আপনারা কিভাবে পরিচিত হয়েছেন, কোথায় দেখা করেছেন, ইত্যাদি।
- আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হতে পারে।
- সাক্ষাৎকারের সময় মার্জিত পোশাক পরুন।
ম্যারেজ ভিসা খরচ
ম্যারেজ ভিসার খরচ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম হতে পারে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে একটি ধারণা দেওয়া হলোঃ
| দেশ | ভিসার নাম | আনুমানিক খরচ (USD) | আনুমানিক খরচ (BDT) |
| যুক্তরাষ্ট্র | CR-1/IR-1 | $1,200 – $2,000 | ১,৪৬,০০০-২,৪৪,০০০ |
| যুক্তরাজ্য | স্পাউস ভিসা | £1,523 (প্রায় $1,900) | ২,১৯,০০০ টাকা প্রায়। |
| কানাডা | স্পাউসাল স্পনসরশিপ | CAD 1,050 (প্রায় $800) | ৯৩,০০০ টাকা প্রায়। |
| অস্ট্রেলিয়া | পার্টনার ভিসা | AUD 7,715 (প্রায় $5,800) | ৬,৩২,০০০ টাকা প্রায়। |
এই খরচগুলো শুধুমাত্র ভিসার আবেদনের জন্য। এর সাথে আপনার অন্যান্য খরচও যোগ হতে পারে, যেমন মেডিকেল পরীক্ষা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, এবং ভ্রমণের খরচ।
ম্যারেজ ভিসা আবেদন করার সময়সীমা
ম্যারেজ ভিসার আবেদন করার সময়সীমা বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হতে পারে। সাধারণত, এটি নির্ভর করে আপনার দেশের ভিসা প্রক্রিয়াকরণের গতির উপর। কিছু দেশে এই প্রক্রিয়া কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় নিতে পারে।
ম্যারেজ ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ
ম্যারেজ ভিসা প্রত্যাখ্যান হওয়ার কিছু সাধারণ কারণ আছে। যেমনঃ
- আবেদনে ভুল তথ্য দিলে।
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হলে।
- আর্থিক প্রমাণ দেখাতে না পারলে।
- যদি মনে হয় বিয়েটা শুধুমাত্র ভিসা পাওয়ার জন্য করা হয়েছে।
- আবেদনকারীর কোনো প্রকার ক্রিমিনাল রেকর্ড থাকলে।
ম্যারেজ ভিসা আপিল প্রক্রিয়া
যদি আপনার ম্যারেজ ভিসা প্রত্যাখ্যান হয়, তাহলে আপিল করার সুযোগ থাকে। আপিল করার প্রক্রিয়াটি সাধারণত নির্ভর করে সেই দেশের আইনের ওপর, যেখানে আপনি আবেদন করেছিলেন।
আপিল করার জন্য, প্রথমে আপনাকে প্রত্যাখ্যানের কারণ জানতে হবে। তারপর, সেই কারণগুলোর বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। আপিল করার সময়সীমার মধ্যে আপনাকে আপিল করতে হবে।
ম্যারেজ ভিসা আইনজীবী
ম্যারেজ ভিসার প্রক্রিয়াটি জটিল হতে পারে। একজন অভিজ্ঞ ভিসা আইনজীবী আপনাকে সঠিকভাবে আবেদন করতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে সাহায্য করতে পারেন।
ম্যারেজ ভিসা বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য, ম্যারেজ ভিসা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। তারা আপনার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
ম্যারেজ ভিসা ফর্ম ডাউন-লোড
ম্যারেজ ভিসার ফর্ম সাধারণত যে দেশের ভিসার জন্য আবেদন করছেন, সেই দেশের ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
ম্যারেজ ভিসা সম্পর্কিত টিপস
- আবেদন করার আগে ভালোভাবে গবেষণা করুন এবং সঠিক তথ্য দিন।
- সব কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন।
- ইন্টারভিউয়ের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিন।
- সময়মতো আবেদন করুন, যাতে কোনো সমস্যা না হয়।
- সৎ থাকুন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলুন।
বৈবাহিক সম্পর্ক প্রমাণ করার উপায়
আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক প্রমাণ করার জন্য কিছু উপায় নিচে উল্লেখ করা হলো:
- বিয়ের ছবি ও ভিডিও জমা দিন।
- একসাথে বসবাসের প্রমাণ দিন (যদি থাকে)।
- যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা সম্পত্তির দলিল দিন।
- পরিবার এবং বন্ধুদের চিঠি বা হলফনামা দিন।
- যোগাযোগের রেকর্ড, যেমন ফোন কল এবং মেসেজের স্ক্রিনশট দিন।
এই ছিলো ম্যারেজ ভিসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। আশা করি, এই তথ্যগুলো আপনার জন্য সহায়ক হবে এবং আপনি আপনার জীবন সঙ্গীর সাথে সুন্দর জীবন শুরু করতে পারবেন।
আরো জানুনঃ
- ভিসা প্রত্যাখ্যান? বাংলাদেশিদের জন্য করনীয় জানুন
- দুবাই বিজনেস ভিসা। খরচ, সুবিধা ও আবেদন প্রক্রিয়া
- মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম ভিসা
- ইউরোপ ভিসা প্রসেসিং
- আমেরিকার ভিজিট ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা
- যুক্তরাজ্য ব্লু কার্ড ভিসা। যোগ্যতা, সুবিধা ও আবেদন
- ইউকে হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ভিসা।বেতন,খরচ ও সুবিধা
- ভিসার জন্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট তৈরি করার নিয়ম
- নতুন পাসপোর্টে ভিসা পাওয়ার উপায়। জানুন সহজ টিপস
- মালয়েশিয়া বিজনেস ভিসা। খরচ, যোগ্যতা ও আবেদন
