মাল্টিপল ভিসা কি? সুবিধা ও পাওয়ার উপায় জেনে নিন।
আপনি কি কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে একবার বিদেশ ঘুরে আসার পর আবার সেখানে যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু নতুন করে ভিসা করার ঝামেলায় আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি?
ভিসা প্রসেসিংয়ের সেই লম্বা লাইন, কাগজপত্রের পাহাড় আর ইন্টারভিউয়ের টেনশন বারবার কে-ই বা নিতে চায়! ঠিক এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই কাজ করে ‘মাল্টিপল ভিসা’ যা বর্তমানে বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসু এবং ব্যবসায়ীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।
মাল্টিপল ভিসা মানে কি?
সহজ কথায় বলতে গেলে, মাল্টিপল ভিসা হলো এমন একটি বিশেষ অনুমতিপত্র যা দিয়ে আপনি নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে যতবার খুশি সেই দেশে যাতায়াত করতে পারবেন। ধরুন, আপনার কাছে ভারতের এক বছরের একটি মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা আছে। এর মানে হলো, এই এক বছরের মধ্যে আপনি যতবার ইচ্ছে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যেতে পারবেন এবং ফিরে আসতে পারবেন।
প্রতিবার যাওয়ার জন্য আপনাকে আলাদা করে আর কোনো আবেদন করতে হবে না বা নতুন করে টাকা ফি দিতে হবে না। এটি অনেকটা আপনার বাসার চাবির মতো, যা দিয়ে আপনি যখন খুশি তালা খুলে ঢুকতে পারেন এবং বের হতে পারেন, যতক্ষণ না চাবির মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
সাধারণত টুরিস্ট বা বিজনেস ক্যাটাগরিতে এই ধরনের ভিসা বেশি দেওয়া হয় যাতে মানুষের যাতায়াত সহজ হয়।
মাল্টিপল ভিসার সুবিধা কী কী
মাল্টিপল ভিসার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি আপনার সময় এবং শ্রম দুটোই বাঁচায়। আপনাকে প্রতিবার ভ্রমণের আগে এম্বাসিতে দৌড়াতে হবে না, যা আপনার মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। আর্থিক দিক থেকেও এটি বেশ লাভজনক, কারণ একবার বড় অংকের ফি দিয়ে ভিসা করলে পরবর্তী কয়েকবার ভ্রমণের জন্য আর কোনো ফি লাগছে না।
যাঁরা হুটহাট ঘুরতে যেতে পছন্দ করেন বা যাঁদের ব্যবসায়িক কাজে হুট করে অন্য দেশে যেতে হয়, তাঁদের জন্য এটি আশীর্বাদের মতো। জরুরি প্রয়োজনে বা মেডিকেল ইমারজেন্সিতেও এই ভিসা আপনাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
মাল্টিপল ভিসা ও ভিজিটর ভিসার মধ্যে পার্থক্য কি
অনেকেই মাল্টিপল ভিসা এবং ভিজিটর ভিসাকে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু এদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য আছে। ভিজিটর ভিসা মূলত ভ্রমণের উদ্দেশ্য বোঝায়, যা সিঙ্গেল এন্ট্রি বা মাল্টিপল এন্ট্রি-উভয় প্রকারেরই হতে পারে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে এদের মূল পার্থক্যগুলো দেখে নেওয়া যাকঃ
| বৈশিষ্ট্য | সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিজিটর ভিসা | মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা |
|---|---|---|
| প্রবেশের সংখ্যা | মাত্র একবার | মেয়াদের মধ্যে যতবার খুশি |
| মেয়াদ শেষ হওয়া | একবার দেশ থেকে বের হলেই মেয়াদ শেষ | মেয়াদের দিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর |
| খরচ | প্রতিবার নতুন করে ফি দিতে হয় | একবার ফি দিলেই দীর্ঘ সময় চলে |
| আবেদন প্রক্রিয়া | প্রতিবার ভ্রমণের আগে আবেদন করতে হয় | একবার করলেই কয়েক বছরের ছুটি |
সহজ কথায়, সব মাল্টিপল ভিসাই ভিজিটর ভিসা হতে পারে, কিন্তু সব ভিজিটর ভিসা মাল্টিপল নয়।
মাল্টিপল ভিসায় কোন কোন দেশে যাওয়া যায় ও খরচ কত?
বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বর্তমানে অনেক দেশ মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা প্রদান করছে। দেশভেদে এই ভিসার মেয়াদ এবং খরচ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। নিচে জনপ্রিয় কিছু দেশের তথ্য দেওয়া হলোঃ
| দেশের নাম | ভিসার মেয়াদ | আনুমানিক খরচ (টাকায়) |
|---|---|---|
| ভারত | ১ থেকে ৫ বছর | ৮৫০ টাকা (ভিসা প্রসেসিং ফি) |
| থাইল্যান্ড | ৬ মাস (মাল্টিপল) | ১৫,০০০ – ২০,০০০ টাকা |
| মালয়েশিয়া | ৩ থেকে ১২ মাস | ৫,০০০ – ৭,০০০ টাকা |
| ইউএসএ (যুক্তরাষ্ট্র) | ৫ থেকে ১০ বছর | ১৮,০০০ – ২০,০০০ টাকা |
| যুক্তরাজ্য (ইউকে) | ৬ মাস থেকে ১০ বছর | ১৫,০০০ – ১,০০,০০০+ টাকা |
| সিঙ্গাপুর | ১ থেকে ২ বছর | ৫,০০০ – ৬,০০০ টাকা |
বি.দ্রঃ এই খরচগুলো এম্বাসি ফি এবং সময়ভেদে পরিবর্তন হতে পারে। আবেদনের আগে বর্তমান রেট যাচাই করে নিন।
ভিসা মাল্টিপল এন্ট্রি হলে কিভাবে বুঝবো
আপনার পাসপোর্টে যখন ভিসার স্টিকার লাগানো হয়, তখন সেটি ভালো করে খেয়াল করলেই আপনি বুঝতে পারবেন।
- ভিসা স্টিকারে সাধারণত ‘Number of Entries’ বা ‘Entries’ নামক একটি অপশন থাকে।
- যদি সেখানে ‘M’ বা ‘MULT’ লেখা থাকে, তার মানে এটি একটি মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা।
- কিছু দেশের ভিসায় সংখ্যার বদলে সরাসরি ‘Multiple’ শব্দটিই পরিষ্কারভাবে লেখা থাকে।
- আর যদি সেখানে ’01’ বা ‘S’ লেখা থাকে, তবে বুঝে নেবেন এটি সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা, যা দিয়ে মাত্র একবার যাওয়া যাবে।
মাল্টিপল ভিসার মেয়াদ কতদিন থাকে
মাল্টিপল ভিসার মেয়াদ দেশ এবং আপনার প্রোফাইলের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত পর্যটন ভিসার ক্ষেত্রে এটি ৬ মাস থেকে শুরু করে ১ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে আমেরিকা বা কানাডার মতো দেশগুলো অনেক সময় ৫ থেকে ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী মাল্টিপল ভিসা দিয়ে থাকে।
ইউরোপের শেনজেন দেশগুলো শুরুতে অল্প মেয়াদের দিলেও নিয়মিত ভ্রমণে পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী মাল্টিপল ভিসা দেয়। মনে রাখবেন, ভিসার মেয়াদ ৫ বছর হলেও আপনি কিন্তু একটানা ৫ বছর সেখানে থাকতে পারবেন না। প্রতিবার ভ্রমণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন ৯০ দিন) বেঁধে দেওয়া থাকে, যার বেশি থাকা আইনত দণ্ডনীয়।
মাল্টিপল ভিসার অসুবিধা
সবকিছুরই যেমন ভালো দিক আছে, মাল্টিপল ভিসারও কিছু ছোটখাটো অসুবিধার দিক থাকতে পারে। প্রথমত, মাল্টিপল ভিসার আবেদন ফি সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসার চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আপনার যদি দীর্ঘমেয়াদী ভিসা থাকে এবং আপনি যদি দীর্ঘদিন সেই দেশে না যান, তবে পরবর্তী রিনিউয়ালের সময় সমস্যা হতে পারে।
কিছু দেশ মাল্টিপল ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি নথিপত্র এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই করে, যা কিছুটা বিরক্তিকর হতে পারে। এছাড়া, পাসপোর্টের মেয়াদ যদি ভিসার মেয়াদের আগে শেষ হয়ে যায়, তবে অনেক সময় নতুন পাসপোর্টের সাথে পুরাতন পাসপোর্ট বহন করার ঝামেলা পোহাতে হয়। তবে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই এখানে অনেক বেশি।
মাল্টিপল ভিসা পাওয়ার টিপস এবং ট্রিকস
আপনি যদি প্রথমবারের মতো মাল্টিপল ভিসার জন্য আবেদন করেন, তবে আপনার ট্রাভেল হিস্ট্রি বা ভ্রমণের ইতিহাস ভালো হওয়া জরুরি।
আগে দুই-তিনটি দেশ ঘুরে আসলে এম্বাসি আপনার ওপর আস্থা পায় এবং সহজেই মাল্টিপল ভিসা দিয়ে দেয়। আপনার আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ হিসেবে ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল সঠিকভাবে জমা দিন। ব্যবসায়ী হলে মেম্বারশিপ সার্টিফিকেট এবং ট্রেড লাইসেন্স আপনার আবেদনকে আরও শক্তিশালী করবে।
ইন্টারভিউয়ের সময় হাসিমুখে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলুন এবং কেন আপনার বারবার যাওয়া প্রয়োজন তা বুঝিয়ে বলুন। সঠিক তথ্য এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখলে মাল্টিপল ভিসা পাওয়া মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়। আপনার পরবর্তী বিদেশ ভ্রমণ হোক আরও সহজ, আনন্দদায়ক এবং ঝামেলামুক্ত।
আরো জানুনঃ
- জার্মানিতে ausbildung ভিসার জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সহ বিস্তারিত
- ব্রুনাই ভিসা প্রসেসিং। আবেদন, খরচ, বেতন সহ বিস্তারিত
- মালয়েশিয়া বিজনেস ভিসা। খরচ, যোগ্যতা ও আবেদন
- মালয়েশিয়া কনস্ট্রাকশন ভিসা। খরচ, বেতন, আবেদন, ও যোগ্যতা
- মালয়েশিয়া কলিং ভিসা। আবেদন, খরচ, বেতন, ও দরকারি তথ্য
- মালয়েশিয়ায় ওভারস্টে জরিমানা কত? জানুন বিস্তারিত






