ইউরোপে কাজের সুযোগ খুঁজছেন, কিন্তু জার্মানি বা ইতালির মতো বড় দেশগুলোর জটিল নিয়ম আর দীর্ঘ প্রতিযোগিতার কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছেন? তাহলে বাল্টিক অঞ্চলের সুন্দর ও ছিমছাম দেশ লিথুয়ানিয়া হতে পারে আপনার জন্য চমৎকার একটি বিকল্প।
বর্তমানে লিথুয়ানিয়ায় আইটি, লজিস্টিকস, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং কনস্ট্রাকশন খাতে প্রচুর বিদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো, “লিথুয়ানিয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা” নিয়ে অনলাইনে এত বেশি ভুল তথ্য আর দালালের চটকদার বিজ্ঞাপন ঘুরে বেড়াচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অনেকেই জানেন না যে, শুধু ভিসা পেলেই সেখানে গিয়ে যেকোনো কাজ করা যায় না। এর জন্য নির্দিষ্ট কাজের চুক্তি এবং আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
তাই দালালদের “১০০% ভিসা গ্যারান্টি”-র ফাঁদে পা দেওয়ার আগে, ২০২৬ সালের লেটেস্ট আপডেট অনুযায়ী লিথুয়ানিয়ায় কাজের ভিসার সঠিক নিয়ম, খরচ এবং আবেদনের এ-টু-জেড প্রক্রিয়া সহজ ভাষায় জেনে নিন।
লিথুয়ানিয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা আসলে কী?
লিথুয়ানিয়ায় কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা উঠলেই বেশিরভাগ মানুষ সাধারণ ‘ওয়ার্ক ভিসা’ বা ‘National Visa D’-এর কথা ভাবেন। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়। লিথুয়ানিয়ার ইমিগ্রেশনের নিয়মে এই দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে:
১. ন্যাশনাল ভিসা ডি (National Visa D)
এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশ ভিসা, যা দিয়ে লিথুয়ানিয়ায় সর্বোচ্চ এক বছর থাকা যায়। কিন্তু ২০২৫ সালের পর থেকে সাধারণ চাকরিজীবীদের এই ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এটি শুধু নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরি, যেমন— সিজনাল ওয়ার্কার (মৌসুমি কর্মী), পোস্টেড ওয়ার্কার বা জাহাজের ক্রুদের জন্য ইস্যু করা হয়।
২. টেম্পোরারি রেসিডেন্স পারমিট (TRP)
বাংলাদেশ থেকে যারা রেগুলার চাকরিতে বা ফুল-টাইম কাজের উদ্দেশ্যে লিথুয়ানিয়ায় যেতে চান, তাদের জন্য একমাত্র এবং প্রধান রুট হলো এই TRP। এটি আপনাকে লিথুয়ানিয়ায় বসবাস এবং আপনার নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার (Employer) অধীনে কাজ করার আইনি অধিকার দেয়। সাধারণত এটি ২ বছরের জন্য দেওয়া হয় এবং পরে মেয়াদ বাড়ানো যায়। মনে রাখবেন, এই TRP একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকে। আপনি চাইলেই হুট করে কোম্পানি বদলাতে পারবেন না, বদলাতে হলে ইমিগ্রেশনের নতুন অনুমোদন লাগবে।
সহজ কথায় বলতে গেলে— লিথুয়ানিয়ায় কাজ করতে চাইলে আপনাকে সাধারণ ভিসার পেছনে না ছুটে, সঠিক নিয়োগকর্তা ম্যানেজ করে ‘TRP’-র জন্যই আবেদন করতে হবে।
বাংলাদেশিদের জন্য লিথুয়ানিয়ায় কোন কাজের চাহিদা বেশি?
লিথুয়ানিয়া সরকারের একটি ‘Shortage Occupation List’ বা ঘাটতি পেশার তালিকা রয়েছে। যেসব পেশায় তাদের দেশে কর্মীর অভাব আছে, সেই খাতগুলোতে বিদেশি কর্মীদের জন্য ভিসার নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল থাকে। বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের জন্য সাধারণত নিচের খাতগুলোতে কাজের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে:
- লজিস্টিকস ও ট্রান্সপোর্ট: ট্রাক ড্রাইভার (বিশেষ করে ভারী যান), বাস ড্রাইভার, ফর্কলিফট অপারেটর এবং ওয়্যারহাউস কর্মী।
- কনস্ট্রাকশন ও ম্যানুফ্যাকচারিং: ওয়েল্ডার (Welder), সিএনসি (CNC) মেশিন অপারেটর, প্লাম্বার, ম্যাশন, কার্পেন্টার, মেকানিক এবং ইলেকট্রিশিয়ান।
- আইটি ও টেকনোলজি: সফটওয়্যার ডেভেলপার, সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট, ডেটা অ্যানালিস্ট এবং আইটি সাপোর্ট (মূলত উচ্চ শিক্ষিতদের জন্য)।
- হসপিটালিটি ও হেলথকেয়ার: কুক বা শেফ, হাউসকিপিং, কেয়ারগিভার, বয়স্কদের সেবাদানকারী এবং নার্স।
- কৃষিকাজ: ফার্ম ওয়ার্কার এবং গ্রিনহাউস বা সিজনাল কর্মী।
বাস্তব সত্য: “লিথুয়ানিয়ায় প্রচুর লোক নিচ্ছে”— কোনো এজেন্টের মুখে এই কথা শুনেই টাকা জমা দিয়ে দেবেন না। সেদেশে কাজের চাহিদা আছে মানেই আপনার ভিসা নিশ্চিত নয়। আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভাষার দক্ষতা এবং লিথুয়ানিয়ান কোম্পানির একটি বৈধ অফার লেটার থাকলেই কেবল আপনি ভিসা পাওয়ার আশা করতে পারেন।
TRP বা ওয়ার্ক পারমিটের জন্য প্রাথমিক যোগ্যতা ও শর্তাবলি
লিথুয়ানিয়ার ইমিগ্রেশন (Migration Department) সিস্টেম বেশ কড়াকড়ি এবং গোছানো। ২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী, কাজের ভিত্তিতে TRP পাওয়ার জন্য আপনাকে নিচের মূল শর্তগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি অবশ্যই পূরণ করতে হবে:
১. কাজের সাথে সম্পর্কিত শিক্ষা: আপনি যে পদে কাজ করতে যাচ্ছেন (যেমন- ওয়েল্ডার বা ইলেকট্রিশিয়ান), ঠিক সেই পদের ওপর আপনার প্রাসঙ্গিক ডিগ্রি, ডিপ্লোমা বা ট্রেড সার্টিফিকেট থাকতে হবে।
২. কাজের অভিজ্ঞতা: যদি সার্টিফিকেট না থাকে, তবে চিন্তার কিছু নেই। আপনার যদি গত ৩ বছরের মধ্যে অন্তত ১ বছর একই পদে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা (Experience Letter) থাকে, তাহলেও আপনি যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
৩. কোটা সিস্টেম ও বেতনের নির্দিষ্ট হিসাব (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত): লিথুয়ানিয়ায় বিদেশি কর্মীদের জন্য প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ‘কোটা’ (Quota) বা লিমিট থাকে। যদি আপনি এমন সময় আবেদন করেন যখন সাধারণ কোটা শেষ হয়ে গেছে, তখন TRP পেতে হলে আপনাকে বেতনের একটি কড়া শর্ত মানতে হবে:
- ঘাটতি পেশার ক্ষেত্রে (Shortage list): আপনার অফার লেটারে মাসিক ন্যূনতম বেতন কমপক্ষে ২,৪১১.৪০ ইউরো হতে হবে।
- অন্যান্য সাধারণ পেশায়: আপনার মাসিক বেতন কমপক্ষে ২,৮৯৩.৬৮ ইউরো হতে হবে।
- হাই-স্কিলড বা ব্লু কার্ড প্রফেশনাল: যারা উচ্চতর দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে যাবেন, তাদের বেতন লিথুয়ানিয়ার জাতীয় গড় বেতনের অন্তত ১.২ গুণ থেকে ১.৫ গুণ বেশি হতে হবে। চাকরির চুক্তিতে এই বেতনের অংকটি ঠিকমতো লেখা না থাকলে ইমিগ্রেশন সরাসরি ফাইল রিজেক্ট করে দিতে পারে।
এর পাশাপাশি আরও কিছু সাধারণ শর্ত আপনাকে মানতে হবে:
- চুক্তির মেয়াদ: আপনার চাকরির চুক্তিপত্রটি (Employment Contract) অবশ্যই ফুল-টাইম (Full-time) হতে হবে এবং এর মেয়াদ কমপক্ষে ৬ মাসের বেশি হতে হবে।
- ভাষার দক্ষতা (IELTS লাগবে কি না?): লিথুয়ানিয়ার ওয়ার্ক ভিসার জন্য সরকারিভাবে ‘IELTS’ বাধ্যতামূলক নয়। তবে আপনাকে অবশ্যই কাজ চালানোর মতো ইংরেজি জানতে হবে। কারণ, নিয়োগকর্তা যখন আপনার ইন্টারভিউ নেবেন, তখন আপনাকে ইংরেজিতেই কথা বলতে হবে।
- বয়স: নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমার কথা আইনে বলা না থাকলেও, আবেদনকারীকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক (১৮+) হতে হবে এবং কাজের ধরন অনুযায়ী শারীরিকভাবে সক্ষম হতে হবে।
ভিসা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস
লিথুয়ানিয়ার ইমিগ্রেশন ডকুমেন্টের বিষয়ে খুবই কড়া। নিচে দেওয়া কাগজগুলো একদম নিখুঁতভাবে গুছিয়ে তবেই আবেদনের জন্য এগোতে হবে:
- পাসপোর্ট: অরিজিনাল পাসপোর্ট, যার মেয়াদ অন্তত ১ বছর বা তার বেশি থাকা ভালো।
- চাকরির চুক্তিপত্র (Employment Contract): লিথুয়ানিয়ান কোম্পানির দেওয়া অফিশিয়াল জব অফার বা চূড়ান্ত চুক্তিনামা, যেখানে আপনার পদ, বেতন এবং কর্মঘণ্টা পরিষ্কার লেখা থাকবে।
- মিডিয়েশন লেটার (Mediation Letter): এটি আপনার নিয়োগকর্তা লিথুয়ানিয়ার MIGRIS সিস্টেমে জমা দেবেন। এই লেটারের একটি নম্বর থাকে, যা আপনার আবেদনের সময় লাগবে।
- শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার সনদ: আপনার পেশা অনুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতার অরিজিনাল সার্টিফিকেট এবং আগের কাজের এক্সপেরিয়েন্স লেটার।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট: আপনার নামে যে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, তার প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ থেকে নেওয়া হালনাগাদ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স।
- অন্যান্য পেপারস: ট্রাভেল হেলথ ইন্স্যুরেন্স (সাধারণত ন্যূনতম ৩০,০০০ ইউরো কভারেজ লাগে), পাসপোর্ট সাইজ ছবি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং লিথুয়ানিয়ায় আপনি কোথায় থাকবেন তার প্রমাণপত্র (Accommodation Proof)।
অ্যাপোস্টিল (Apostille), নোটারি ও অনুবাদের স্পেশাল নিয়ম
আমাদের দেশের অনেকেই মনে করেন নীল রঙের একটি ‘নোটারি পাবলিক’ সিল মারলেই কাজ শেষ! কিন্তু লিথুয়ানিয়ার ক্ষেত্রে নিয়মটি আলাদা:
১. অ্যাপোস্টিল (Apostille): আপনার শিক্ষাগত সনদ প্রথমে শিক্ষা বোর্ড বা মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই করে, এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MOFA) থেকে অবশ্যই ‘অ্যাপোস্টিল’ বা সত্যায়িত করতে হবে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এবং জন্মনিবন্ধন বা কাবিননামার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
২. ইংরেজি অনুবাদ: আপনার কোনো কাগজ বা সিল যদি বাংলায় থাকে, তবে তা অবশ্যই একজন সার্টিফাইড অনুবাদককে দিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ (Translate) করিয়ে নিতে হবে।
অনুবাদ নিয়ে খরচ বাঁচানোর ট্রিকস (ইংরেজি বনাম লিথুয়ানিয়ান)
দালালরা অনেক সময় বলে যে, লিথুয়ানিয়ায় ফাইল জমা দিতে হলে কাবিননামা বা অন্যান্য কাগজ লিথুয়ানিয়ান ভাষায় অনুবাদ করতে হবে (যা বাংলাদেশ থেকে করা প্রায় অসম্ভব এবং অনেক ব্যয়বহুল)। কিন্তু আসল সত্য হলো, MIGRIS সিস্টেমে আপনার সমস্ত ডকুমেন্টের
সঠিক ইংরেজি অনুবাদ (English Translation) শতভাগ গ্রহণযোগ্য। শুধু খেয়াল রাখবেন, অনুবাদের পর তাতে যেন সার্টিফাইড নোটারি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MOFA) অ্যাপোস্টিল সিল থাকে। খামোখা লিথুয়ানিয়ান ভাষা খুঁজতে গিয়ে বাড়তি টাকা নষ্ট করার কোনো দরকার নেই।
বাংলাদেশ থেকে আবেদনের ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
অনেকেই মনে করেন, জব অফার পেলেই বুঝি সরাসরি এম্বাসিতে যাওয়া যায়। কিন্তু লিথুয়ানিয়ার TRP পাওয়ার প্রক্রিয়াটি মূলত ৫টি ধাপে সম্পন্ন হয়:
ধাপ ১: সঠিক মাধ্যমে চাকরি খোঁজা
প্রথম কাজ হলো লিথুয়ানিয়ার কোনো অনুমোদিত কোম্পানির কাছ থেকে কাজের অফার পাওয়া। আপনি LinkedIn, EURES বা লিথুয়ানিয়ার অফিশিয়াল জব পোর্টালগুলোতে নিজে চেষ্টা করতে পারেন অথবা কোনো লাইসেন্সধারী ভালো এজেন্সির সাহায্য নিতে পারেন।
ধাপ ২: নিয়োগকর্তা কর্তৃক ‘মিডিয়েশন লেটার’ ইস্যু
আপনি জব অফার পাওয়ার পর, আপনার লিথুয়ানিয়ান নিয়োগকর্তা সেদেশের ‘লেবার এক্সচেঞ্জ’-এ পদটি নিবন্ধন করবেন এবং MIGRIS (লিথুয়ানিয়ান মাইগ্রেশন ইনফরমেশন সিস্টেম) পোর্টালে আপনার জন্য একটি ‘Mediation Letter’ জমা দেবেন। এর জন্য নিয়োগকর্তাকে একটি নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়।
ধাপ ৩: MIGRIS পোর্টালে আপনার অনলাইন আবেদন
মিডিয়েশন লেটার নম্বর পাওয়ার পর, আপনাকে MIGRIS পোর্টালে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। সেখানে TRP-র জন্য অনলাইন ফর্ম পূরণ করে আপনার সমস্ত অরিজিনাল ডকুমেন্টের স্ক্যান কপি খুব সতর্কতার সাথে আপলোড করে সাবমিট করতে হবে।
ধাপ ৪: ভারতে গিয়ে VFS Global-এ ফাইল জমা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
এখানেই বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে লিথুয়ানিয়ার কোনো এম্বাসি বা VFS সেন্টার নেই। তাই বাংলাদেশি নাগরিকদের লিথুয়ানিয়ার ভিসা প্রসেসিংয়ের ইন-পারসন কাজ (যেমন- মূল কাগজ জমা দেওয়া এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা বায়োমেট্রিক দেওয়া) ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত VFS Global-এ গিয়ে করতে হয়।
MIGRIS পোর্টালে ৪ মাসের কড়া নিয়ম (The 4-Month Rule) অনেকেই অনলাইনে MIGRIS-এ আবেদন সাবমিট করার পর ভারতের ভিসা বা অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য মাসের পর মাস দেরি করেন। কিন্তু লিথুয়ানিয়ান মাইগ্রেশন ডিপার্টমেন্টের কড়া নিয়ম হলো— অনলাইনে ফর্ম সাবমিট করার ঠিক ৪ মাসের (১২০ দিন) মধ্যে আপনাকে ভিএফএস (VFS) সেন্টারে গিয়ে সশরীরে বায়োমেট্রিক ও অরিজিনাল কাগজ জমা দিতেই হবে। এর একদিন পার হয়ে গেলে আপনার আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং জমা দেওয়া ১৬০ ইউরো ফি পুরোটাই জলে যাবে।
- প্রো-টিপস: ভারতে গিয়ে এই কাজ করার জন্য আপনার সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসা হলে চলবে না, আপনাকে ভারতের ‘Indian X Double Entry Visa’-এর জন্য আবেদন করতে হবে।
ধাপ ৫: সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
সব কাগজ ও বায়োমেট্রিক জমা দেওয়ার পর আপনার কাজ শেষ। ফাইল প্রসেস হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে সাধারণত ২ থেকে ৩ মাস (কখনো ৪ মাস) সময় লাগতে পারে। ভিসা অ্যাপ্রুভ হলে আপনাকে ইমেইলে জানিয়ে দেওয়া হবে।
ভিসা প্রসেসিং সময় এবং আনুমানিক খরচ
লিথুয়ানিয়ার TRP (Temporary Residence Permit) বা ওয়ার্ক পারমিটের সরকারি ফি ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ হাতের নাগালেই। তবে বাংলাদেশিদের যেহেতু ভারতে গিয়ে ফাইল জমা দিতে হয়, তাই যাতায়াত খরচ মিলিয়ে বাজেট কিছুটা বেড়ে যায়। নিচে খরচের একটি আনুমানিক হিসাব দেওয়া হলো:
| খরচের বিবরণ | পরিমাণ ও সময় |
|---|---|
| TRP আবেদন ফি (State Fee) | ১৬০ ইউরো (সাধারণ) / ৩২০ ইউরো (জরুরি প্রসেসিং) |
| মিডিয়েশন লেটার ফি | ৫০ ইউরো (এটি সাধারণত নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি বহন করে) |
| VFS গ্লোবাল সার্ভিস ফি | আনুমানিক ৩০ থেকে ১২০ ইউরো (লোকেশন অনুযায়ী) |
| প্রসেসিং সময় | সাধারণত ২ থেকে ৩ মাস (কখনো ৪ মাস লাগতে পারে) |
*নোট: এই খরচের বাইরে আপনার ডকুমেন্টস অনুবাদ, অ্যাপোস্টিল, মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স এবং ভারতে গিয়ে VFS-এ জমা দেওয়ার যাতায়াত ও থাকার খরচ আলাদাভাবে বাজেটে রাখতে হবে।
সতর্কতা: দালাল ও প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায়
লিথুয়ানিয়ায় কর্মীর প্রচুর চাহিদা থাকায় দালাল চক্র এটিকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতারণা থেকে বাঁচতে নিচের বিষয়গুলো সবসময় মনে রাখবেন:
- ‘১০০% ভিসা গ্যারান্টি’ মানেই প্রতারণা: ভিসা দেওয়ার এখতিয়ার শুধু লিথুয়ানিয়ান ইমিগ্রেশনের। কোনো ভিএফএস (VFS) বা দালাল আপনাকে ভিসা নিশ্চিত করার গ্যারান্টি দিতে পারে না।
- মিডিয়েশন লেটারের ফি: MIGRIS পোর্টালে এই লেটার জেনারেট করার সরকারি ফি মাত্র ৫০ ইউরো, যা কোম্পানি দেয়। অথচ অনেক দালাল এর কথা বলে লাখ টাকা দাবি করে।
- অ্যাকাউন্ট যাচাই: কখনোই ব্যক্তিগত বা পারসোনাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা লেনদেন করবেন না।
- নিয়োগকর্তা যাচাই: জব অফার পেলে কোম্পানির নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং ঠিকানা লিথুয়ানিয়ার সরকারি ডিরেক্টরি থেকে নিজে সার্চ করে যাচাই করে নিন।
বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু স্পেশাল টিপস
- ভারতীয় X-ভিসা পাওয়ার চাবিকাঠি: দিল্লি VFS-এ বায়োমেট্রিক দেওয়ার জন্য ভারতীয় হাই কমিশন থেকে ‘Double Entry X-Visa’ নিতে হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, শুধু আবেদন করলেই ভারত এই ভিসা দেয় না। আবেদনের সাথে লিথুয়ানিয়ান এম্বাসির কনফার্মেশন মেইল বা VFS-এর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার প্রিন্ট করে এটাচ না করলে ভারতীয় দূতাবাস এই স্পেশাল ভিসা রিজেক্ট করে দেয়।
- দিল্লিতে ফাইল জমার সময় অতিরিক্ত দিন হাতে রাখা: অনেকেই মনে করেন একদিনেই VFS-এ ফাইল জমা দিয়ে ঢাকা ফিরে আসবেন। বাস্তবে দিল্লির VFS সেন্টারে প্রায়ই ডকুমেন্টের মূল কপি যাচাই বা অতিরিক্ত ক্ল্যারিফিকেশনের জন্য ১-২ দিন সময় চেয়ে বসে। তাই দিল্লি যাওয়ার টিকিট কাটার সময় অন্তত ৪ থেকে ৫ দিন থাকার মতো মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মেয়াদের ফাঁদ: বাংলাদেশ থেকে তোলা পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মেয়াদ থাকে ৬ মাস। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MOFA) থেকে অ্যাপোস্টিল করানো, ভারতের ভিসা নেওয়া এবং দিল্লির VFS-এ অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে পেতেই ৩-৪ মাস কেটে যায়। ফাইল জমা দেওয়ার দিন যদি পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মেয়াদ শেষ প্রান্তে থাকে, তবে তারা ফাইল আটকে দেয়। তাই জব অফার নিশ্চিত হওয়ার পরই একদম ফ্রেশ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স তোলা উচিত।
- কোম্পানির বৈধতা নিজে চেক করার ট্রিকস: কোনো দালাল আপনাকে লিথুয়ানিয়ান কোম্পানির অফার লেটার দিলে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবেন না। লিথুয়ানিয়ার সরকারি কোম্পানি রেজিস্ট্রি সাইট ‘Rekvizitai.vz.lt’-এ গিয়ে কোম্পানির নাম সার্চ করুন। সেখানে কোম্পানির কর্মী সংখ্যা কত, তারা সরকারকে নিয়মিত ট্যাক্স দেয় কি না এবং কর্মীদের গড় বেতন কত—সব স্পষ্ট দেখা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মী সংখ্যা শূন্য বা ১-২ জন হলে বুঝবেন সেটি ভুয়া বা শেল কোম্পানি।
লিথুয়ানিয়া ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
লিথুয়ানিয়ার TRP কার্ড দিয়ে কি ইউরোপের অন্যান্য দেশে যাওয়া যায়?
হ্যাঁ। লিথুয়ানিয়া শেনজেনভুক্ত দেশ হওয়ায় বৈধ TRP কার্ড থাকলে আপনি জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি সহ যেকোনো শেনজেন দেশে ট্যুরিস্ট হিসেবে বিনা ভিসায় ঘুরতে পারবেন। তবে সেখানে আইনিভাবে কাজ করতে পারবেন না।
সেখানে যাওয়ার পর কি কোম্পানি বা কাজ পরিবর্তন করা সম্ভব?
হুট করে সম্ভব নয়। TRP নির্দিষ্ট কোম্পানির সাথে যুক্ত থাকে। কোম্পানি বদলাতে হলে লিথুয়ানিয়ার মাইগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট (MIGRIS) থেকে আগেই লিখিত অনুমতি নিতে হবে।
চাকরি চলে গেলে কি সাথে সাথে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়?
না। চাকরি চলে গেলে সাধারণত ১ মাসের মতো একটি নির্দিষ্ট সময় (Grace Period) পাওয়া যায়। এই সময়ের মধ্যে নতুন স্পন্সর বা কোম্পানি খুঁজে ইমিগ্রেশনে আবেদন জমা দিতে হয়।
লিথুয়ানিয়ায় কত বছর কাজ করলে স্থায়ী বসবাস (PR) পাওয়া যায়?
টানা ৫ বছর বৈধভাবে কাজ করা এবং নিয়মিত ট্যাক্স দেওয়ার পর পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির (PR) আবেদন করা যায়। এর জন্য লিথুয়ানিয়ান ভাষার প্রাথমিক লেভেলের একটি পরীক্ষায় পাস করতে হয়।
কাজের ভিসায় সর্বোচ্চ বয়সসীমা কত?
কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে এবং নিয়োগকর্তার কাজ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা ও কাজের দক্ষতা থাকতে হবে।
অফিশিয়াল রিসোর্স এবং সোর্স অফ ইনফরমেশন
এই আর্টিকেলে দেওয়া যাবতীয় তথ্য লিথুয়ানিয়া সরকারের ইমিগ্রেশন ও অফিশিয়াল পোর্টাল থেকে যাচাই করা। তথ্যের সত্যতা যাচাই বা সর্বশেষ আপডেট জানতে নিচের অফিশিয়াল লিংকগুলোতে ক্লিক করে ভিজিট করতে পারেন:
- অনলাইন আবেদন ও মাইগ্রেশন পোর্টাল: MIGRIS (Migration Department Lithuania)
- বাংলাদেশিদের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত দূতাবাস: Embassy of Lithuania in New Delhi
- বায়োমেট্রিক ও ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট: VFS Global Lithuania (India)
- ঘাটতি পেশা ও সরকারি লেবার এক্সচেঞ্জ: Employment Service (Užimtumo tarnyba)
আরো জানুনঃ
সতর্কবার্তা:
আমাদের ওয়েবসাইটের তথ্যসমূহ কেবল দেশী ও প্রবাসীদের তথ্যগত সহায়তা ও সচেতনতার জন্য প্রকাশিত। আমরা কোনো ভিসা এজেন্সি নই এবং সরাসরি ভিসা প্রদান করি না। ভিসা আবেদনের পূর্বে সবসময় সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা এম্বাসির নির্দেশনা অনুসরণ করুন। যেকোনো আর্থিক লেনদেন নিজ দায়িত্বে করুন।

আমি মুরশিদ আলম- পেশায় শিক্ষক ও ইমিগ্রেশন বিষয়ক গবেষক। বিদেশগামী বাংলাদেশী নাগরিকেরা যেন সঠিক, তথ্যভিত্তিক ও প্রতারণামুক্ত তথ্য পেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই visapabo.com-এ নিয়মিত গবেষণাভিত্তিক আর্টিকেল লিখি। আর্টিকেলের তথ্যাবলী বিভিন্ন দেশের অফিশিয়াল ইমিগ্রেশন পোর্টাল থেকে যাচাই করে প্রকাশ করি। তথ্যের কোনো গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আপডেট জেনে নিন অথবা মতামত থাকলে নিচের কমেন্ট বক্সে জানানোর অনুরোধ রইল।
✉ ইমেইলঃ visapabo@gmail.com | 🌐 ওয়েবসাইটঃ visapabo.com


