পর্তুগাল রেসিডেন্স কার্ড দিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ম

পর্তুগালে বৈধ রেসিডেন্ট পারমিট (Título de Residência) পাওয়ার পর প্রবাসীদের জন্য ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সীমান্তগুলো উন্মুক্ত হয়ে যায়। তবে মুক্ত চলাচলের সুবিধা পেলেও পর্তুগাল রেসিডেন্স কার্ড দিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ম সঠিকভাবে মেনে না চললে মারাত্মক আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সরাসরি মূল বিষয়ে আসি; পর্তুগিজ টিআরসি কার্ডধারীরা যেকোনো সেঙ্গেনভুক্ত রাষ্ট্রে কোনো ধরনের বাড়তি ভিসা ছাড়াই সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত পর্যটন বা পারিবারিক উদ্দেশ্যে অবস্থান করতে পারেন। তবে এই ট্রাভেল পারমিশনকে অন্য দেশে স্থায়ীভাবে কাজ করা বা বসবাসের অনুমতি মনে করা অভিবাসন আইনের সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি।

পর্তুগাল রেসিডেন্স কার্ড দিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ম

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অফিসিয়াল সেঙ্গেন বর্ডার কোড (Schengen Borders Code) অনুযায়ী পর্তুগিজ রেসিডেন্স কার্ডধারী ব্যক্তিরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিসামুক্ত অঞ্চলের পূর্ণ সুবিধা পান। ফ্রান্সে প্রবেশ করা বা জার্মানি ও ইতালিতে সড়কপথে সীমান্ত অতিক্রম করার ক্ষেত্রে সাধারণ পর্যটকদের মতো ভিসা প্রদর্শনের কোনো প্রয়োজন হয় না।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বহু বাংলাদেশি ভাই মনে করেন এই কার্ড হাতে থাকলে ইউরোপের যেকোনো দেশে আজীবন থাকা যায়। বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুল, কারণ সেঙ্গেন আইন অনুযায়ী যে দেশ রেসিডেন্স কার্ড ইস্যু করেছে, প্রবাসীকে প্রধানত সেই দেশেই নিজের কর ও সামাজিক সুরক্ষা বজায় রেখে বসবাস করতে হবে।

ভ্রমণের ধরনঅনুমোদিত সর্বোচ্চ সময়সীমাকাজের অনুমতি (Work Rights)প্রয়োজনীয় মূল ট্রাভেল ডকুমেন্ট
সেঙ্গেন ট্যুরিজম / ভিজিট১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিনকঠোরভাবে নিষিদ্ধমূল পাসপোর্ট + বৈধ টিআরসি কার্ড
পর্তুগালের ভেতরে অবস্থানকার্ডের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্তআইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধপর্তুগিজ টিআরসি কার্ড ও নিফ (NIF)
অন্য দেশে স্থায়ী চাকরিপারমিট ছাড়া অবস্থান অবৈধসংশ্লিষ্ট দেশের ওয়ার্ক পারমিট আবশ্যকলোকাল ওয়ার্ক ভিসা বা ব্লু কার্ড

১৮০ দিনে ৯০ দিনের ভ্রমণ শর্ত

সেঙ্গেনভুক্ত অন্যান্য রাষ্ট্রে আপনি কতদিন অবস্থান করতে পারবেন, তা ‘রোলিং ১৮০ ডে পিরিয়ড’ (Rolling 180-Day Rule) পদ্ধতির মাধ্যমে হিসেব করা হয়। অর্থাৎ যেকোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে দাঁড়িয়ে পেছনের ১৮০ দিনের মধ্যে আপনার অন্য দেশে কাটানো মোট দিন গণনা করা হবে।

একটি সাধারণ বাস্তব নিয়ম হলো আপনি যদি টানা ৯০ দিন জার্মানি বা ফ্রান্সে থাকেন, তবে আপনাকে পরবর্তী ৯০ দিনের জন্য অবশ্যই সেই দেশগুলোর সীমানা ছেড়ে পর্তুগালে ফেরত আসতে হবে। এই সময়ের সীমা অতিক্রম করলে তাকে ওভারস্টে হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ফলে ইমিগ্রেশন পুলিশ কার্ড বাতিল করে ডিপোর্টেশনের নোটিশ জারি করতে পারে।

AIMA এক্সটেনশন পেপারের আইনি সীমাবদ্ধতা

পর্তুগালে অনেকের মূল কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকারি ডিক্রি (Decree Law) অনুসারে মেয়াদ বাড়ানোর একটি এক্সটেনশন পেপার বা রসিদ পাওয়া যায়। এই কাগজটি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে অনেকেই মারাত্মক আইনি ভুলের শিকার হন।

বাস্তব অভিবাসন আইন অনুযায়ী, পর্তুগাল সরকারের দেওয়া এই সাময়িক এক্সটেনশন পেপারের বৈধতা শুধুই পর্তুগালের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ। বৈধ মূল প্লাস্টিক কার্ড ছাড়া এই রসিদ নিয়ে স্পেন, ফ্রান্স বা ইতালির বিমানে চড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ধরা পড়লে এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন পুলিশ সরাসরি ডিটেনশনে পাঠাতে পারে।

প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ও বর্ডার প্রস্তুতি

যদিও সেঙ্গেন জোনের ভেতরে স্থায়ী কোনো সীমান্ত তল্লাশি চৌকি নেই, তবুও যেকোনো দেশের হাইওয়ে বা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে র‍্যান্ডম পুলিশ চেকিং হতে পারে। অসম্পূর্ণ নথিপত্র নিয়ে ভ্রমণ করলে সীমান্ত পুলিশ দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করতে পারে।

ভিসাটি পাওয়ার জনয এবং পরবর্তীতে কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়া ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে নিচে উল্লেখিত কাগজপত্র সঙ্গে রাখা আবশ্যক:

  • মূল পাসপোর্ট: ভ্রমণের তারিখ থেকে ন্যূনতম ৩ মাসের অবশিষ্ট মেয়াদযুক্ত আসল পাসপোর্ট।
  • পর্তুগিজ টিআরসি কার্ড: অক্ষত ও বৈধ আসল ফিজিক্যাল রেসিডেন্স প্লাস্টিক কার্ড।
  • রিটার্ন ট্রাভেল টিকিট: ফ্লাইট, বাস (FlixBus) বা ট্রেনের রিটার্ন টিকেট।
  • বাসস্থান বা হোটেল বুকিং: যে দেশে যাচ্ছেন সেখানকার হোটেলের রিজার্ভেশন পেপার অথবা স্বজনের ইনভাইটেশন লেটার।
  • আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ: আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড বা নগদ ইউরো (দৈনিক গড়ে ৫০–৭০ ইউরো বাজেট থাকা ভালো)।
  • ইউরোপীয় হেলথ ইন্স্যুরেন্স: জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ট্রাভেল মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স কপি।

অন্য দেশে কাজের ঝুঁকি ও ব্ল্যাকলিস্ট

অনেকেই পর্তুগালের টিআরসি কার্ড পাওয়ার পর দ্রুত ফ্রান্স, বেলজিয়াম বা সুইজারল্যান্ডে গিয়ে ভালো বেতনে কাজে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পর্তুগালের কার্ড দিয়ে অন্য কোনো ইউরোপিয়ান দেশে কাজ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

যদি কোনো প্রবাসী ফ্রান্সে পর্তুগিজ কার্ড নিয়ে কাজ করা অবস্থায় ধরা পড়েন, তবে সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ তাকে সরাসরি ‘OQTF’ (Obligation de Quitter le Territoire Français) বা দেশত্যাগের নির্দেশ ধরিয়ে দেয়। এর ফলে শুধু যে ওই দেশে কাজের সুযোগ নষ্ট হয় তা নয়, বরং পুরো সেঙ্গেন ইনফরমেশন সিস্টেম (SIS) ডাটাবেসে ১ থেকে ৫ বছরের ব্ল্যাকলিস্ট রেড অ্যালার্ট বসে যায়। সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় পর্তুগাল রেসিডেন্স কার্ড দিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ম অনুযায়ী কেবল ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই এই কার্ড ব্যবহার করা নিরাপদ।

ইউকে ও নন-সেঙ্গেন দেশের নিয়ম

ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত হলেও সব দেশ কিন্তু সেঙ্গেন চুক্তির আওতায় পড়ে না। এই বিষয়টি না জেনে ট্রাভেল প্ল্যান করলে এয়ারপোর্টে চরম বিপদের মুখে পড়তে হয়। নিচের টেবিলে পর্তুগিজ কার্ড দিয়ে নন-সেঙ্গেন দেশগুলোর প্রবেশাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরা হলোঃ

দেশের নাম / অঞ্চলভিসার প্রয়োজনীয়তাপর্তুগিজ কার্ডের সুবিধা
যুক্তরাজ্য (UK / London)আলাদা ইউকে ভিজিট ভিসা আবশ্যককোনো ভিসা ছাড় বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা নেই
আয়ারল্যান্ড (Ireland)আইরিশ ট্রাভেল ভিসা আবশ্যকসেঙ্গেনের বাইরে থাকায় সরাসরি প্রবেশ নিষেধ
রোমানিয়া ও বুলগেরিয়াসম্পূর্ণ ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকারনতুন সেঙ্গেন সদস্য হিসেবে ৯০ দিন বৈধ
সাইপ্রাস (Cyprus)ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকারসীমিত মেয়াদে পর্যটন ভ্রমণের সুযোগ

ট্যাক্স কন্টিনিউ ও ইইউ পিআর সুবিধা

অনেকে ঘুরতে গিয়ে বা অন্য দেশে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে পর্তুগালের সোশ্যাল সিকিউরিটি (Segurança Social) এবং ইনকাম ট্যাক্স পেমেন্ট বন্ধ করে দেন। এটি করলে পরবর্তীতে স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়।

আবেদনকারীদের এই ভুলটি সবচেয়ে বেশি করতে দেখা যায় যে তারা পর্তুগালে ট্যাক্স বন্ধ করে বছরের পর বছর বাইরে কাটান। তবে পর্তুগালে ৫ বছর নিয়মিত ট্যাক্স দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্দেশিকা Directive 2003/109/EC অনুযায়ী EU Long-Term Residence Permit অর্জন করলে, ইউরোপের অন্যান্য দেশে গিয়ে রেসিডেন্স ট্রান্সফার করে বৈধভাবে কাজ খোঁজা ও স্থায়ী হওয়ার আইনি সুযোগ তৈরি হয়। সঠিক উপায়ে পর্তুগাল রেসিডেন্স কার্ড দিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ম মেনে চললে ভবিষ্যতে এই সুবিধা সহজে পাওয়া যায়।

ট্রাভেলারদের বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

পর্তুগালের রেসিডেন্স কার্ড দিয়ে কি সরাসরি ইউকে (যুক্তরাজ্য) যাওয়া যায়?

না। ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য সম্পূর্ণ আলাদা ইমিগ্রেশন নীতি অনুসরণ করে; বাংলাদেশি পাসপোর্টে পর্তুগিজ কার্ড থাকলেও লন্ডনে যেতে আগে থেকেই ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে ভিসা নিতে হবে।

পর্তুগালের বাইরে অন্য দেশে কি ড্রাইভিং করা সম্ভব?

হ্যাঁ। আপনার পর্তুগিজ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা বৈধ আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট থাকলে ইউরোপের যেকোনো সেঙ্গেন দেশে ব্যক্তিগত গাড়ি বা রেন্টাল কার চালানো সম্পূর্ণ বৈধ।

পর্তুগালের বাইরে একটানা কতদিন থাকা যায়?

অস্থায়ী কার্ডধারীদের জন্য একবারে টানা ৬ মাস বা কার্ডের মেয়াদের মধ্যে মোট ৮ মাসের বেশি পর্তুগালের বাইরে অবস্থান করলে AIMA কার্ডটি বাতিল করার এখতিয়ার রাখে।

পর্তুগালের বাইরে অন্য দেশে সন্তান প্রসব হলে কি সে দেশের নাগরিকত্ব পাবে?

না। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব নেই; সন্তানের আইনি স্ট্যাটাস পর্তুগালের আইনি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

সেঙ্গেন দেশে ৯০ দিনের বেশি অবস্থান করলে জরিমানা কত হতে পারে?

দেশভেদে ৫০০ থেকে ১,৫০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে এবং পাসপোর্টে সেঙ্গেন ইনফরমেশন সিস্টেমে (SIS) ১ থেকে ৩ বছরের জন্য প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) জারি হতে পারে।

শেষ কথা

ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসের মূল আনন্দ হলো স্বাধীনভাবে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা। অভিবাসন আইনের প্রতিটি ধারা মাথায় রেখে পর্তুগাল রেসিডেন্স কার্ড দিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চললে কোনো প্রকার পুলিশি ঝামেলা ছাড়াই পুরো মহাদেশ ঘুরে আসা সম্ভব।

পোস্টটি পড়ার পর আপনার প্রথম কাজ হবে ভ্রমণের আগে পাসপোর্টের মেয়াদ ও ট্রাভেলের তারিখ মিলিয়ে দেখা। অন্য দেশে অবৈধভাবে কাজ করার ফাঁদে না পড়ে পর্তুগালে নিজের ট্যাক্স ও সোশ্যাল সিকিউরিটি ঠিক রেখে ৫ বছর পর ইউরোপীয় লং-টার্ম পিআর বা স্থায়ী নাগরিকত্ব অর্জনের দিকে মনোযোগ দিন।

তথ্যসূত্র

  • পর্তুগাল অভিবাসন ও ইন্টিগ্রেশন এজেন্সি: রেসিডেন্ট পারমিটের সর্বশেষ শর্ত ও নবায়ন নীতি জানতে ভিজিট করুন Agência para a Integração, Migrações e Asilo (AIMA)
  • ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেঙ্গেন ট্রাভেল পোর্টাল: সেঙ্গেন বর্ডার কোড ও ভ্রমণ নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন European Commission Migration and Home Affairs

আরো জানুনঃ

সতর্কবার্তা:

আমাদের ওয়েবসাইটের তথ্যসমূহ কেবল দেশী ও প্রবাসীদের তথ্যগত সহায়তা ও সচেতনতার জন্য প্রকাশিত। আমরা কোনো ভিসা এজেন্সি নই এবং সরাসরি ভিসা প্রদান করি না। ভিসা আবেদনের পূর্বে সবসময় সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা এম্বাসির নির্দেশনা অনুসরণ করুন। যেকোনো আর্থিক লেনদেন নিজ দায়িত্বে করুন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top