কানাডা স্কুলিং ভিসা। আবেদন থেকে ভর্তি পর্যন্ত সঠিক নির্দেশনা

কানাডা আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি স্বপ্নের দেশ হতে পারে। সেখানে পড়াশোনা করার জন্য যে বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়, তাকেই সহজ ভাষায় আমরা কানাডা স্কুলিং ভিসা বলে থাকি।

কানাডা স্কুলিং ভিসা কি?

এটি মূলত একটি স্টাডি পারমিট যা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া হয়। সাধারণত ৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এই ভিসার আওতায় কানাডার প্রাইমারি বা সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়।

আপনার সন্তান যদি বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে পরিচিত হতে চায়, তবে এই ভিসা হতে পারে প্রথম ধাপ। এটি কেবল একটি পড়ালেখার সুযোগ নয়, বরং উন্নত জীবনযাত্রার একটি প্রবেশদ্বার।

কানাডা স্কুলিং ভিসায় যেতে কি কি যোগ্যতা দরকার?

কানাডায় পড়তে যাওয়ার জন্য আপনার সন্তানের বয়স অবশ্যই ৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হতে হবে। যেহেতু সে অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাই সেখানে তার দেখভালের জন্য একজন অভিভাবক বা লিগ্যাল গার্ডিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক।

সন্তানকে কানাডার কোনো স্বীকৃত স্কুল (ডিএলআই তালিকাভুক্ত) থেকে অফার লেটার বা ভর্তির অনুমতি পেতে হবে। এছাড়া আপনার পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রমাণের সামর্থ্য থাকতে হবে যাতে সেখানে পড়াশোনা ও থাকার খরচ চালানো যায়।

সন্তানের শারীরিক সুস্থতা প্রমাণের জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি তার বিগত কয়েক বছরের স্কুলের রেজাল্ট শিট বা ট্রান্সক্রিপ্ট ভালো থাকা জরুরি।

কানাডা স্কুলিং ভিসা পাওয়ার সঠিক উপায় কি?

এই ভিসা পাওয়ার প্রথম ধাপ হলো আপনার পছন্দের একটি স্কুল খুঁজে বের করা। আপনি সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো স্কুলেই আবেদন করতে পারেন, তবে সেটি অবশ্যই শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত হতে হবে।

স্কুল থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর আপনাকে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদন প্রক্রিয়াটি বেশ সূক্ষ্ম, তাই প্রতিটি তথ্য নির্ভুলভাবে দেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে পড়াশোনা শেষ করে আপনার সন্তান নিজ দেশে ফিরে আসবে। এই বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারলেই ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

কানাডা স্কুলিং ভিসা পেতে যে যে কাগজপত্র লাগবে

আবেদনের জন্য প্রথমেই সন্তানের একটি বৈধ পাসপোর্ট লাগবে যার মেয়াদ অন্তত ৬ মাস আছে। স্কুলের অফার লেটার বা একসেপ্টেন্স লেটারটি মূল কপি হিসেবে সাথে রাখতে হবে।

অভিভাবকত্বের প্রমাণ হিসেবে ‘কাস্টোডিয়ান ডিক্লারেশন’ ফর্ম পূরণ করতে হবে। এটি কানাডার একজন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দার মাধ্যমে সই করানো থাকতে হয়।

পিতামাতার আয়ের উৎস এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের কাগজগুলো খুব গুরুত্বের সাথে গুছিয়ে নিতে হবে। এছাড়া সন্তানের জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং সবশেষ স্কুলের একাডেমিক রেকর্ডগুলো ইংরেজি বা ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনুবাদ করে জমা দিতে হবে।

কানাডা স্কুলিং ভিসায় যাওয়ার আনুমানিক খরচ

নিচের টেবিলে আপনি খরচের একটি প্রাথমিক ধারণা পাবেন। মনে রাখবেন, এটি স্কুল এবং প্রদেশের ওপর ভিত্তি করে কমবেশি হতে পারে।

খরচের খাতআনুমানিক পরিমাণ (কানাডিয়ান ডলার)বাংলাদেশি টাকা (প্রায়)
স্কুলের টিউশন ফি (বার্ষিক)$১০,০০০ – $১৮,০০০৮,৫০,০০০ – ১৫,৫০,০০০ টাকা
ভিসা আবেদন ফি$১৫০১৩,০০০ টাকা
বায়োমেট্রিক ফি$৮৫৭,৫০০ টাকা
স্বাস্থ্য বীমা$৬০০ – $১,০০০৫০,০০০ – ৮৫,০০০ টাকা
বইপত্র ও অন্যান্য$৫০০ – $১,০০০৪২,০০০ – ৮৫,০০০ টাকা

কানাডা স্কুলিং ভিসা পেতে আবেদন করার নিয়ম

আবেদন করার জন্য আপনাকে প্রথমে কানাডা সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (IRCC) এ একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় সব স্ক্যান করা ডকুমেন্ট আপলোড করতে হবে।

এরপর আপনাকে আবেদন ফি এবং বায়োমেট্রিক ফি অনলাইনে পরিশোধ করতে হবে। পেমেন্ট সম্পন্ন হলে আপনাকে বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপ দেওয়ার জন্য একটি তারিখ দেওয়া হবে।

বাংলাদেশে ভিএফএস গ্লোবাল (VFS Global) সেন্টারে গিয়ে বায়োমেট্রিক দিয়ে আসতে হবে। এরপর আপনার আবেদনটি পর্যালোচনার জন্য জমা হবে এবং ফলাফল ইমেলের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।

কানাডায় জীবনযাত্রার মাসিক খরচ

সন্তানকে নিয়ে কানাডায় থাকতে গেলে আপনার কেমন খরচ হতে পারে, তার একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলো।

খরচের খাতমাসিক আনুমানিক খরচ (CAD)মন্তব্য
বাসা ভাড়া$১,২০০ – $২,৫০০শহরের ওপর নির্ভর করে
খাবার ও গ্রোসারি$৪০০ – $৬০০নিজেদের রান্নার ওপর নির্ভর করে
যাতায়াত খরচ$১০০ – $১৫০পাবলিক ট্রান্সপাস
ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ/গ্যাস)$১৫০ – $২৫০বাসার সাইজ অনুযায়ী
মোবাইল ও ইন্টারনেট$৮০ – $১২০প্যাকেজ অনুযায়ী

কানাডা স্কুলিং ভিসার ব্যাংক স্টেটমেন্ট

ব্যাংক স্টেটমেন্ট হলো এই ভিসার প্রাণ। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার কাছে অন্তত এক বছরের টিউশন ফি এবং জীবনযাত্রার খরচ চালানোর মতো টাকা আছে।

সাধারণত ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা ব্যাংকে দেখানো নিরাপদ বলে মনে করা হয়। এই টাকা অন্তত ৪ থেকে ৬ মাস ধরে অ্যাকাউন্টে থাকা ভালো।

টাকার উৎসের সঠিক ব্যাখ্যা এবং ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। হঠাৎ করে বড় অংকের টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকলে ভিসা অফিসার সন্দেহ করতে পারেন, তাই নিয়মিত লেনদেন দেখান।

কানাডা স্কুলিং ভিসায় কত দিন থাকা যায়

এই ভিসার মেয়াদ সাধারণত আপনার সন্তানের পাসপোর্টের মেয়াদ বা স্কুলের অফার লেটারের মেয়াদের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত এক থেকে দুই বছরের জন্য প্রাথমিক ভিসা দেওয়া হয়।

পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতি বছর কানাডার ভেতর থেকেই স্টাডি পারমিট রিনিউ বা নবায়ন করা যায়। আপনার সন্তান যতদিন পড়াশোনা করবে, ততদিন সে সেখানে থাকার অনুমতি পাবে।

তবে মনে রাখবেন, পাসপোর্ট শেষ হয়ে গেলে ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। তাই সব সময় পাসপোর্টের মেয়াদের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

কানাডা স্কুলিং ভিসার প্রসেসিং এর সময় কত দিন

আবেদন করার পর ভিসা হাতে পেতে সাধারণত ৮ থেকে ১২ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে এটি সিজন এবং আবেদনের চাপের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন হতে থাকে।

বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক আবেদন জমা পড়ায় মাঝে মাঝে ৩ থেকে ৪ মাসও সময় লাগতে পারে। তাই সেশন শুরুর অন্তত ৫-৬ মাস আগে থেকেই প্রক্রিয়া শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

অনলাইনে আবেদনের স্ট্যাটাস চেক করার সুবিধা থাকে। তাই আপনি ঘরে বসেই জানতে পারবেন আপনার ফাইলটি কোন পর্যায়ে আছে।

কানাডা স্কুলিং ভিসার কতগুলো সুবিধা ও অসুবিধা

যেকোনো বড় সিদ্ধান্তের মতো এরও কিছু ভালো এবং মন্দ দিক আছে। নিচের টেবিলটি আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

সুবিধার দিকঅসুবিধার দিক
বিশ্বমানের শিক্ষা ও পরিবেশপড়াশোনার খরচ বেশ চড়া
ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধিপরিবারের থেকে দূরে থাকার মানসিক চাপ
ভবিষ্যতে পিআর (PR) পাওয়ার সহজ পথনতুন আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে
উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তাভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও দীর্ঘ

কানাডা স্কুলিং ভিসা সহায়তাকারী সংস্থা

বাংলাদেশে অনেক এজেন্সি এই বিষয়ে কাজ করে। তবে সরাসরি আবেদন করাই সবচেয়ে নিরাপদ। কিছু পরিচিত সেন্টারের তথ্য নিচে দেওয়া হলোঃ

প্রতিষ্ঠানের নামঅবস্থানসেবা
VFS Globalঢাকা ও চট্টগ্রামবায়োমেট্রিক ও পাসপোর্ট জমা
IDP Educationধানমন্ডি/গুলশানকাউন্সিলিং ও ভর্তি সহায়তা
Mentors’বনানী/কালিগঞ্জস্টাডি অ্যাব্রোড গাইডেন্স

কানাডা স্কুলিং ভিসায় পিতামাতার ভিসা পাওয়ার নিয়ম

আপনার সন্তান যদি ছোট হয়, তবে তার সাথে যাওয়ার জন্য আপনি ‘ভিজিটর ভিসা’ বা ‘টিআরভি’ (TRV) আবেদন করতে পারেন। কানাডা সরকার সাধারণত ছোট বাচ্চাদের একা ছাড়তে চায় না।

পিতামাতা হিসেবে আপনি সেখানে গিয়ে কাজ করার অনুমতি পাবেন না, তবে সন্তানের দেখাশোনা করতে পারবেন। আপনার আবেদনের সময় সন্তানের স্টাডি পারমিটের রেফারেন্স দিতে হবে।

আপনাকে আলাদাভাবে আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রমাণ করতে হবে যে আপনি সেখানে গিয়ে নিজের খরচ চালাতে পারবেন। সন্তানের পড়াশোনা শেষ হলে বা সে ১৮ বছর পার করলে আপনার ভিসার ধরণ পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে।

আরো জানুনঃ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top