সন্তানকে আমেরিকার স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন অনেক অভিভাবকই দেখেন। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে কিংবা সামান্য কিছু আইনি ভুলের কারণে অনেকেরই এই স্বপ্ন কনস্যুলেট অফিসারের টেবিল থেকে সরাসরি বাতিল হয়ে যায়।
মাইনর বা স্কুলিং ভিসার (F-1) ক্ষেত্রে আমেরিকান ইমিগ্রেশন সিস্টেম অত্যন্ত কড়াকড়ি। এখানে শুধু টাকা থাকলেই ভিসা মেলে না। ভিসা নিশ্চিত করতে হলে আপনাকে অবশ্যই স্টুডেন্ট অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ ভিজিটর প্রোগ্রাম (SEVP) অনুমোদিত সঠিক স্কুল নির্বাচন করতে হবে, বৈধ আই-২০ (Form I-20) সংগ্রহ করতে হবে এবং এক বছরের সম্পূর্ণ খরচ বহনের নিখুঁত ব্যাংকিং প্রমাণ দেখাতে হবে।
- ট্যুরিস্ট ভিসায় (B-2) আমেরিকায় গিয়ে সন্তানের স্কুল পরিবর্তনের চেষ্টা করলে ইমিগ্রেশন জালিয়াতির দায়ে আজীবনের জন্য ভিসা ব্যান হতে পারে।
- পাবলিক হাই স্কুলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ ১২ মাস পড়ার সুযোগ থাকে এবং সম্পূর্ণ আন-সাবসিডাইজড খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়।
- ফর্ম আই-২০ হাতে পাওয়ার পর এর ভেতরের এসইভিস (SEVIS) আইডিতে নামের বানান বা তারিখে সামান্য ভুল থাকলে ভিসা রিজেক্ট হয়ে যায়।
এসইভিপি (SEVP) অনুমোদিত স্কুল এবং আই-২০ ফর্ম পাওয়ার সঠিক প্রক্রিয়া
ভিসা ইন্টারভিউয়ের টেবিলে বসার আগেই আপনার সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনের বিষয়টি ইমিগ্রেশন অফিসাররা নিবিড়ভাবে যাচাই করেন। আমেরিকায় চাইলেই যেকোনো স্কুলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো যায় না।
স্কুলটিকে অবশ্যই এসইভিপি-সার্টিফাইড হতে হবে। অনেক অভিভাবক না বুঝে পরিচিত কারও বাড়ির কাছের এমন কোনো স্কুলে ভর্তির আবেদন করেন, যেগুলোর আই-২০ ইস্যু করার কোনো আইনি ক্ষমতাই নেই। এই ধরনের স্কুল থেকে ভুয়া বা ভুল আই-২০ নিয়ে ইন্টারভিউতে গেলে ভিসা মুহূর্তেই বাতিল হয়ে যায়।
পাবলিক বনাম প্রাইভেট স্কুল: যেখানে অনেকেই ভুল করেন
আমেরিকার ইমিগ্রেশন আইনে পাবলিক এবং প্রাইভেট স্কুলের ক্ষেত্রে এফ-১ ভিসার নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা। এসইভিপি-সার্টিফাইড প্রাইভেট স্কুলগুলো আপনার সন্তানের সম্পূর্ণ মেয়াদের জন্য ভিসার স্পন্সর হতে পারে। কিন্তু পাবলিক স্কুলের ক্ষেত্রে একজন বিদেশি শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ এক বছর বা ১২ মাস পড়ার সুযোগ পায়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমেরিকান নাগরিকদের করের টাকায় চলা পাবলিক স্কুলের সুবিধার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীকে স্থানীয় বাজারের পুরো খরচটি (Per-capita cost) অ্যাডভান্স পরিশোধ করতে হয়।
ইন্টারভিউয়ের আগে এসইভিস (SEVIS) ফি পেমেন্ট
স্কুল থেকে আই-২০ পাওয়ার পর আপনার প্রথম কাজ হলো ভিসা ইন্টারভিউয়ের অন্তত ৩ দিন আগে অনলাইনে ৩৫০ ডলারের এসইভিস ফি পরিশোধ করা। অনেকেই ফি পরিশোধ করেন ঠিকই, কিন্তু পেমেন্ট কনফার্মেশন রসিদটি প্রিন্ট করে সাথে নিতে ভুলে যান। এই ছোট্ট ভুলের কারণে কনস্যুলেট গেট থেকেই অনেক অভিভাবককে ফাইলসহ ফেরত পাঠানো হয়।
আর্থিক সচ্ছলতা এবং ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টের গোপন আইনি প্যাচ
আমেরিকা স্কুলিং ভিসার রিজেকশনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো সন্দেহজনক ব্যাংক ব্যালেন্স দেখানো। কনস্যুলার অফিসাররা আপনার অ্যাকাউন্টে কত কোটি টাকা আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন সেই টাকা কোথা থেকে এসেছে তার ওপর।
আপনাকে অন্তত সন্তানের প্রথম বছরের সম্পূর্ণ টিউশন ফি এবং থাকা-খাওয়ার খরচ মেটানোর মতো তরল অর্থ (Liquid funds) দেখাতে হবে। এখানেই অনেকে একটি মারাত্মক ভুল করে বসেন। ভিসা ইন্টারভিউয়ের ঠিক কিছুদিন আগে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে হুট করে বিশাল অঙ্কের টাকা জমা করা হয়।
কনস্যুলার অফিসাররা এই “হঠাৎ ফুলে ওঠা” অ্যাকাউন্টগুলোকে লোন করা বা জালিয়াতির ফান্ড হিসেবে ধরে নেন। আপনার ট্যাক্স রিটার্ন বা মাসিক আয়ের সাথে ব্যাংক ব্যালেন্সের যদি কোনো যৌক্তিক সামঞ্জস্য না থাকে, তবে আই-১৩৪ (Form I-134) স্পন্সরশিপ ফর্ম থাকা সত্ত্বেও অফিসার ভিসা নামঞ্জুর করে দেবেন।
ভিসা ইন্টারভিউ এবং মাইনর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা
কম বয়সি বা মাইনর শিক্ষার্থীদের ভিসা ইন্টারভিউয়ের মনস্তত্ত্ব প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। এখানে কনস্যুলার অফিসার মূলত শিশুর পড়াশোনার আসল উদ্দেশ্য এবং স্পন্সরের সাথে তার পারিবারিক সম্পর্ক যাচাই করেন।
অভিভাবকরা অনেক সময় বাচ্চাদের মুখস্থ উত্তর শিখিয়ে ইন্টারভিউতে পাঠান। কিন্তু অফিসাররা প্রতিদিন শত শত মানুষের ইন্টারভিউ নেন; তারা এই স্ক্রিপ্ট করা উত্তরগুলো মুহূর্তেই ধরে ফেলেন। এছাড়া অনেক স্কুল ভর্তির সময় সরাসরি আইইএলটিএস (IELTS) বা টোফেল (TOEFL) না চাইলেও, ইন্টারভিউয়ের সময় যদি অফিসার দেখেন যে শিশুটির ইংরেজিতে যোগাযোগ করার ন্যূনতম সক্ষমতা নেই, তবে তিনি পড়াশোনার অক্ষমতার কারণ দেখিয়ে ভিসা বাতিল করতে পারেন।
বাবা-মায়ের ট্যুরিস্ট ভিসার (B-2) সীমাবদ্ধতা
আরেকটি বড় আইনি বাধা হলো, সন্তানের এফ-১ ভিসার ওপর ভিত্তি করে বাবা-মায়ের জন্য আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের কোনো ডিপেন্ডেন্ট ভিসা নেই। সাধারণত বাবা-মায়েরা বি-২ ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে সন্তানের সাথে যাতায়াত করেন। কিন্তু এই ট্যুরিস্ট ভিসা ব্যবহার করে একটানা ৬ মাসের বেশি সময় আমেরিকায় থেকে যাওয়ার চেষ্টা করলে কাস্টমস ও বর্ডার প্রটেকশন (CBP) আপনার ট্রাভেল রেকর্ডকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ভবিষ্যতে ভিসা বাতিলের ঝুঁকিতে ফেলে।
FAQs
এফ-১ স্কুলিং ভিসাধারী শিক্ষার্থীরা কি আমেরিকায় পার্ট-টাইম কাজ করতে পারে?
না, মাইনর বা হাই স্কুল স্তরের এফ-১ ভিসাধারী শিক্ষার্থীরা মার্কিন ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী ক্যাম্পাসের ভেতরে বা বাইরে কোনো ধরনের কাজ করার আইনি অনুমতি পায় না। তাদের যাবতীয় খরচ সম্পূর্ণভাবে স্পন্সরের বৈধ তহবিল থেকে বহন করতে হয়।
আমেরিকার হাই স্কুল থেকে কি সরাসরি আইভি লিগ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়?
সরাসরি ভর্তির নিশ্চয়তা কোনো হাই স্কুলই দিতে পারে না। তবে আমেরিকার স্বীকৃত হাই স্কুল থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করলে তা আইভি লিগ বা শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদনের সময় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে।
তথ্যের উৎস
- অফিশিয়াল স্টুডেন্ট ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটর প্রোগ্রাম গাইডলাইন: USCIS SEVP Official Rules
- মার্কিন কনস্যুলার ভিসা প্রসেসিং ম্যানুয়াল: U.S. Department of State
আরো জানুনঃ
সতর্কবার্তা:
আমাদের ওয়েবসাইটের তথ্যসমূহ কেবল দেশী ও প্রবাসীদের তথ্যগত সহায়তা ও সচেতনতার জন্য প্রকাশিত। আমরা কোনো ভিসা এজেন্সি নই এবং সরাসরি ভিসা প্রদান করি না। ভিসা আবেদনের পূর্বে সবসময় সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা এম্বাসির নির্দেশনা অনুসরণ করুন। যেকোনো আর্থিক লেনদেন নিজ দায়িত্বে করুন।

আমি মুরশিদ আলম- পেশায় শিক্ষক ও ইমিগ্রেশন বিষয়ক গবেষক। বিদেশগামী বাংলাদেশী নাগরিকেরা যেন সঠিক, তথ্যভিত্তিক ও প্রতারণামুক্ত তথ্য পেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই visapabo.com-এ নিয়মিত গবেষণাভিত্তিক আর্টিকেল লিখি। আর্টিকেলের তথ্যাবলী বিভিন্ন দেশের অফিশিয়াল ইমিগ্রেশন পোর্টাল থেকে যাচাই করে প্রকাশ করি। তথ্যের কোনো গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আপডেট জেনে নিন অথবা মতামত থাকলে নিচের কমেন্ট বক্সে জানানোর অনুরোধ রইল।
✉ ইমেইলঃ visapabo@gmail.com | 🌐 ওয়েবসাইটঃ visapabo.com


