বিএমইটি কার্ড চেক ১ মিনিটে ২০২৬। ডাউনলোড, নবায়ন সহ বিস্তারিত
বিদেশে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় বিএমইটি কার্ডটি আপনার পাসপোর্টের মতোই মূল্যবান। কিন্তু অনেক সময় আমরা বিএমইটি কার্ড চেক না করে দালালের খপ্পরে পড়ে বা সঠিক তথ্যের অভাবে বুঝতে পারি না আমাদের কার্ডটি আসল নাকি নকল। আজকের এই লেখায় আমি আপনাকে বিএমইটি কার্ড চেক করার একদম সহজ উপায় থেকে শুরু করে এর খুঁটিনাটি সব জানাব। চলুন, আপনার বিদেশ যাত্রাকে নিরাপদ করতে এক ধাপ এগিয়ে যাই।
বিএমইটি কার্ড কি?
বিএমইটি কার্ড চেক করার আগে জেনে নেবো বিএমইটি কি? বিএমইটি (BMET) এর পূর্ণরূপ হলো ‘ব্যুরো অফ ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং’। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান যা বিদেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়টি তদারকি করে। আর বিএমইটি কার্ড হলো একজন প্রবাসী কর্মীর বৈধতার প্রমাণপত্র।
এটি একটি চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ড যেখানে আপনার নাম, ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর এবং আপনি কোন দেশে কোন কাজে যাচ্ছেন-তার সব তথ্য ডিজিটালভাবে জমা থাকে। আপনি যখন বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য রওনা হবেন, তখন ইমিগ্রেশন পুলিশ আপনার এই কার্ডটি যাচাই করবে। এই কার্ড ছাড়া বৈধভাবে বিমানে চড়া বা বিদেশে কাজে যাওয়া বর্তমান নিয়মে প্রায় অসম্ভব।
বিএমইটি কার্ডের সুবিধা
বিএমইটি কার্ড শুধু একটি প্লাস্টিকের টুকরো নয়, এটি প্রবাসীদের জন্য সুরক্ষার একটি কবজ। এই কার্ডটি থাকলে আপনি সরকারের ডাটাবেজে একজন নিবন্ধিত প্রবাসী হিসেবে গণ্য হবেন। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিরাপত্তা। বিদেশে গিয়ে আপনি যদি কোনো বিপদে পড়েন বা আপনার নিয়োগকর্তা যদি আপনার সাথে চুক্তি ভঙ্গ করেন, তবে আপনি বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে আইনি সহায়তা পাবেন।
এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা, সন্তানদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি এবং দুর্ভাগ্যবশত বিদেশের মাটিতে মৃত্যু হলে মরদেহ দেশে আনা ও দাফন-কাফনের জন্য আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই কার্ডটি প্রধান শর্ত হিসেবে কাজ করে। এমনকি বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ সেবাগুলো পেতেও এই কার্ড আপনাকে সাহায্য করবে।
বিএমইটি কার্ড চেক করার সঠিক নিয়ম ২০২৬
আপনার হাতে থাকা কার্ডটি আসল তো? এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই জাগে। অনলাইনের এই যুগে বিএমইটি কার্ড চেক করা এখন মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার। আপনি আপনার স্মার্টফোন বা কম্পিউটার থেকে খুব সহজেই এটি যাচাই করতে পারেন।
সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো বিএমইটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ব্যবহার করা। নিচে ধাপগুলো দেওয়া হলোঃ
১। প্রথমে বিএমইটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা ‘আমি প্রবাসী‘ পোর্টালে যান।
২। সেখানে ‘ম্যান পাওয়ার কার্ড যাচাই‘ অপশনটি খুঁজে বের করে সেখানে ক্লিক করুন। নীচের পেজের মত একটি পেজ ওপেন হবে।

৩। এবার আপনার পাসপোর্ট নম্বরটি নির্দিষ্ট ঘরে লিখুন।
৪। ক্যাপচা কোডটি পূরণ করে ‘বিএমইটি কার্ড যাচাই‘ বাটনে ক্লিক করুন।
যদি আপনার কার্ডটি আসল হয়, তবে স্ক্রিনে আপনার ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য চলে আসবে। আর যদি কোনো তথ্য না দেখায়, তবে বুঝবেন কার্ডটিতে সমস্যা আছে বা এটি এখনো ডাটাবেজে আপডেট হয়নি।
বিএমইটি কার্ড চেক করার অ্যাপ
বর্তমানে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। আপনি যদি ব্রাউজারে গিয়ে ঝামেলা করতে না চান, তবে ‘Ami Probashi’ অ্যাপটি ডাউনলোড করে বিএমইটি কার্ড চেক করে নিতে পারেন। গুগল প্লে-স্টোর থেকে অ্যাপটি ইনস্টল করে আপনার ফোন নম্বর দিয়ে সাইন-ইন করুন।
এরপর ‘Check Clearance’ বা ‘Track Status’ অপশনে গিয়ে আপনার পাসপোর্ট নম্বর দিলে মুহূর্তেই আপনার কার্ডের বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন। এই অ্যাপটি প্রবাসীদের জন্য একটি ওয়ান-স্টপ সলিউশন হিসেবে কাজ করে।
বিএমইটি কার্ড আবেদন করার নিয়ম
বিএমইটি কার্ড চেক করার নিয়ম জেনেছি। এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন এই গুরুত্বপূর্ণ কার্ডটি কীভাবে পাবেন? বিএমইটি কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। আপনি চাইলে ঘরে বসেই ‘আমি প্রবাসী’ (Ami Probashi) অ্যাপের মাধ্যমে প্রাথমিক নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন। তবে মূল স্মার্ট কার্ড বা ক্লিয়ারেন্সের জন্য আপনাকে কিছু ধাপ পার করতে হবে।
প্রথমেই আপনার একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকতে হবে এবং আপনাকে তিন দিনের পিডিও (PDO) বা প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন ট্রেনিং সম্পন্ন করতে হবে। ট্রেনিং শেষ করে সার্টিফিকেট পাওয়ার পর আপনার ভিসা, কর্মসংস্থান চুক্তিপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা জেলা কর্মসংস্থান অফিসে আবেদন করতে হবে। সাধারণত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এই প্রক্রিয়াটি করে দেয়, তবে আপনি চাইলে নিজেও সব তথ্য যাচাই করে নিতে পারেন।
বিএমইটি কার্ডের ফি সংক্রান্ত তথ্য ২০২৬
| ফির বিবরণ | আনুমানিক পরিমাণ (টাকা) |
|---|---|
| ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল | ৩,৫০০ |
| স্মার্ট কার্ড ফি | ২৫০ – ৫০০ |
| বিমা প্রিমিয়াম (বয়সভেদে) | ৪০০ – ১,০০০ |
| মোট | ৪,১৫০ – ৫,০০০ (প্রায়) |
বিএমইটি কার্ড রিনিউ বা নবায়ন করার নিয়ম
বিএমইটি কার্ড চেক করার নিয়ম জানার সাথে সাথে নবায়ন সম্পর্কে জানবো। বিএমইটি কার্ডের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। সাধারণত আপনি যখন ছুটিতে দেশে আসেন এবং পুনরায় বিদেশে যাওয়ার সময় যদি দেখেন আপনার আগের ক্লিয়ারেন্সের মেয়াদ শেষ, তখন আপনাকে এটি রিনিউ বা নতুন করে নিতে হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একবার বিদেশে যাওয়ার পর সেই ভিসার মেয়াদ থাকা পর্যন্ত কার্ডের কার্যকারিতা থাকে।
যদি আপনার নতুন ভিসার জন্য আবার ক্লিয়ারেন্স লাগে, তবে আপনাকে আগের মতোই পাসপোর্ট ও নতুন ভিসার কপি দিয়ে আবেদন করতে হবে। ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মাধ্যমে এখন রি-এন্ট্রি বা নতুন ক্লিয়ারেন্সের আবেদন করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
বিএমইটি কার্ড ডাউনলোড করার নিয়ম ২০২৬
অনেকেই প্রশ্ন করেন যে বিএমইটি কার্ড চেক করার পর সেটি কি অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা যায়? হ্যাঁ, যায়। আপনি যদি বিএমইটির পোর্টালে আপনার পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে সার্চ করেন এবং আপনার তথ্য সঠিক থাকে, তবে সেখানে ‘Download’ বা ‘Print’ এর একটি অপশন পাবেন। অথবা এখানে ক্লিক করে ডাউনলোড করুন।
ডাউনলোড করা এই কপিটি আপনি সাধারণ কাগজে প্রিন্ট করে নিতে পারেন, যা অনেক ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। তবে মনে রাখবেন, বিমানবন্দরে ভ্রমণের সময় আসল চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ডটি সাথে রাখা বাধ্যতামূলক।
বিএমইটি কার্ড সংশোধন করার উপায়
মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে।বিএমইটি কার্ড চেক করার পর আপনার কার্ডে যদি নাম, পাসপোর্ট নম্বর বা জন্ম তারিখে কোনো ভুল থাকে, তবে সেটি দ্রুত সংশোধন করা উচিত। ভুল তথ্য নিয়ে বিদেশে গেলে ইমিগ্রেশনে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কার্ড সংশোধনের জন্য আপনাকে বিএমইটির প্রধান কার্যালয়ে বা জেলা জনশক্তি অফিসে একটি লিখিত আবেদন করতে হবে।
আবেদনের সাথে আপনার সঠিক পাসপোর্টের কপি এবং প্রয়োজনীয় সাপোর্টিং ডকুমেন্ট জমা দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ আপনার তথ্য যাচাই করে কার্ডটি সংশোধন করে দেবে।
বিএমইটি কার্ড হারিয়ে গেলে করণীয়
বিদেশের কর্মব্যস্ত জীবনে বা আসার পথে কার্ডটি হারিয়ে গেলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কার্ড হারিয়ে গেলে প্রথমেই আপনাকে নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করতে হবে। এরপর সেই জিডির কপি এবং আপনার পাসপোর্টের কপি নিয়ে বিএমইটি অফিসে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করতে হবে।
নির্দিষ্ট ফি জমা দিলে তারা আপনাকে একটি ডুপ্লিকেট স্মার্ট কার্ড ইস্যু করবে। মনে রাখবেন, হারানো কার্ডের তথ্য অনলাইনে থেকে যায়, তাই নতুন কার্ড পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।
বিএমইটি কার্ডের মেয়াদ কত দিন
সাধারণত একটি বিএমইটি কার্ডের মাধ্যমে আপনি একবার বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পান। অর্থাৎ, এটি আপনার নির্দিষ্ট ভিসার সাথে সম্পৃক্ত। তবে প্রবাসীদের জন্য যে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্যপদ দেওয়া হয়, তার মেয়াদ সাধারণত ২ বছর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
আপনি যদি একবার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বিদেশে যান এবং সেখানে অবস্থান করেন, তবে সেই মেয়াদের মধ্যেই আপনি কার্ডের সব সুবিধা পাবেন। আবার নতুন ভিসায় অন্য দেশে যেতে চাইলে আপনাকে পুনরায় বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স বা কার্ড প্রসেস করতে হবে।
বিএমইটি কার্ড হেল্পলাইন
বিএমইটি কার্ড চেক বা বিএমইটি কার্ড সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা বা তথ্যের জন্য আপনি সরাসরি সরকারি হেল্পলাইনে যোগাযোগ করতে পারেন।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় হেল্পলাইনঃ ১৬১৩৫ (দেশ থেকে) বা +৮৮০৯৬১০১০৬১৩৫ (বিদেশ থেকে)।
- আমি প্রবাসী হেল্পলাইনঃ তাদের অ্যাপের ভেতরেই সাপোর্ট চ্যাট এবং কন্টাক্ট নম্বর দেওয়া থাকে।
যেকোনো দালালের কথায় কান না দিয়ে অনলাইনে বিএমইটি কার্ড চেক করে কোন সমস্যা হলে সরাসরি এই নম্বরগুলোতে কথা বলে আপনার সমস্যার সমাধান করে নিন। আপনার বিদেশ যাত্রা হোক নিরাপদ এবং আনন্দময়। সঠিগুলো করতে পারবেন।
আরো জানুনঃ
