দুবাই ভিসা চেকিং করুন ৩টি সহজ নিয়মে।
দুবাই ভিসা চেকিং করে আমাদের বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ উন্নত জীবন আর ভালো উপার্জনের আশায় দুবাই পাড়ি জমান। কিন্তু পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বা দালালের কাছ থেকে ভিসার কপি পাওয়ার পর মনে একটা খটকা থেকেই যায়-“আমার ভিসাটা কি আসলে আসল?” কিংবা “ভিসার মেয়াদ কতদিন আছে?”
এখন আর আপনাকে ট্রাভেল এজেন্সির দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করেই ঘরে বসে মাত্র কয়েক মিনিটে আপনি আপনার দুবাই ভিসা চেকিং সম্পন্ন করতে পারবেন। আজকের এই ব্লগে আমি আপনাকে খুব সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে বুঝিয়ে বলব কীভাবে আপনি নিজের ভিসা নিজেই যাচাই করবেন। চলুন তাহলে শুরু করা যাক।
দুবাই ভিসা চেকিং করতে কি কি তথ্য লাগে
দুবাই ভিসা চেকিং করার মূল প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে আপনার কাছে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য থাকা জরুরি। আপনি যখন দুবাই সরকারের অফিসিয়াল পোর্টালে যাবেন, তখন তারা আপনার পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু তথ্য চাইবে। সাধারণত দুবাইয়ের ভিসা চেক করতে আপনার পাসপোর্টের কপিটি সাথে রাখলেই চলে।
প্রধানত আপনার পাসপোর্টের নম্বর এবং পাসপোর্টের মেয়াদের তারিখ প্রয়োজন হবে। অনেক সময় যদি আপনার কাছে ভিসার একটি কপি বা আবেদনপত্র থাকে, তবে সেখানে থাকা ফাইল নম্বর বা অ্যাপ্লিকেশন নম্বর দিয়েও কাজ চালানো যায়। তবে সাধারণ মানুষের জন্য পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে চেক করাটাই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। এছাড়া আপনার জন্ম তারিখ এবং জাতীয়তা সিলেক্ট করার প্রয়োজন হতে পারে। তাই এই ছোটখাটো তথ্যগুলো হাতের কাছে গুছিয়ে নিয়ে বসুন।
পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে দুবাই ভিসা চেকিং করার নিয়ম (১ম নিয়ম)
সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সহজ পদ্ধতি হলো পাসপোর্ট নম্বর ব্যবহার করে দুবাই ভিসা চেকিং করা। এর জন্য আপনাকে প্রথমে দুবাইয়ের ‘Federal Authority for Identity and Citizenship’ বা ICP-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে যেতে হবে। ওয়েবসাইটে প্রবেশের পর আপনি ‘Public Services‘ নামে একটি অপশন পাবেন। সেখানে ক্লিক করলে ‘File Validity‘ নামক একটি ট্যাব দেখতে পাবেন। এই লিংকে ক্লিক করলেই আপনার সামনে একটি ফর্ম চলে আসবে।

ফর্মে আপনাকে প্রথমে ‘Passport Information‘ অপশনটি সিলেক্ট করতে হবে। এরপর ‘Visa’ বা ‘Residency’ যে কোনো একটি বেছে নিন (যদি আপনি নতুন ভিসার জন্য আবেদন করে থাকেন তবে Visa সিলেক্ট করুন)। এবার নিচের বক্সে আপনার পাসপোর্ট নম্বর এবং পাসপোর্টের মেয়াদের তারিখটি সঠিকভাবে লিখুন। ড্রপডাউন মেনু থেকে আপনার দেশ হিসেবে ‘Bangladesh’ সিলেক্ট করুন। সবশেষে ‘I’m not a robot’ ক্যাপচা পূরণ করে ‘Search‘ বাটনে ক্লিক করলেই আপনার ভিসার বর্তমান অবস্থা স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। এটি যেমন সহজ, তেমনি নির্ভরযোগ্য।
ফাইল বা ট্রানজেকশন নম্বর দিয়ে দুবাই ভিসা চেকিং (২য় নিয়ম)
অনেক সময় আপনার কাছে পাসপোর্ট নম্বর ছাড়াও একটি ফাইল নম্বর বা অ্যাপ্লিকেশন নম্বর থাকতে পারে, যা আপনাকে আপনার এজেন্সি বা নিয়োগকর্তা প্রদান করেছেন। যদি পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে কোনো তথ্য খুঁজে না পান, তবে এই ফাইল নম্বর ব্যবহার করে চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ। দুবাইয়ের ভিসার কপির উপরের দিকে সাধারণত এই ফাইল নম্বরটি লেখা থাকে। এটি মূলত তিনটি বা চারটি অংশে বিভক্ত থাকে (যেমনঃ 201/2023/123456)।

ICP ওয়েবসাইট বা GDRFA পোর্টালে গিয়ে “Visa status” অপশনে ক্লিক করে ‘File’ অপশনটি সিলেক্ট করে নিন অথবা সরাসরি ঢুকতে এখানে ক্লিক করুন। সেখানে আপনার ভিসার কপিতে থাকা নম্বরগুলো নির্দিষ্ট বক্সে বসান। এখানে মনে রাখবেন, দুবাইয়ের প্রতিটি এমিরেটসের (যেমন দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ) জন্য ফাইল নম্বরের ফরম্যাট কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সঠিকভাবে নম্বর ইনপুট দেওয়ার পর সার্চ করলে আপনি দেখতে পাবেন আপনার ভিসাটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে-এটি কি এপ্রুভ হয়েছে নাকি এখনো প্রসেসিংয়ে আছে।
দুবাই ভিসা চেকিং করার অ্যাপস (৩য় নিয়ম)
প্রযুক্তির এই যুগে ওয়েবসাইট ছাড়াও আপনি অ্যাপের মাধ্যমে খুব সহজে দুবাই ভিসা চেকিং করতে পারেন। দুবাই সরকার বিদেশি পর্যটক এবং কর্মীদের সুবিধার জন্য বেশ কিছু চমৎকার মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘UAEICP’ এবং ‘DubaiNow’। অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা প্লে-স্টোর থেকে এবং আইফোন ব্যবহারকারীরা অ্যাপ স্টোর থেকে এই অ্যাপগুলো ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
অ্যাপটি ওপেন করার পর আপনাকে খুব বেশি ঝক্কি পোহাতে হবে না। অ্যাপের ভেতরে ‘Status Inquiry’ বা ‘Track Application’ অপশনে গিয়ে আপনার পাসপোর্ট নম্বর বা ফাইল নম্বর দিলেই তাৎক্ষণিক রেজাল্ট পাওয়া যায়। যারা নিয়মিত দুবাই যাতায়াত করেন বা যাদের স্মার্টফোনে কাজ করতে সুবিধা হয়, তাদের জন্য এই অ্যাপগুলো আশীর্বাদের মতো। বিশেষ করে ‘UAEICP’ অ্যাপটি ইন্টারফেসের দিক থেকে খুবই ইউজার ফ্রেন্ডলি এবং দ্রুত কাজ করে।
দুবাই ভিসা চেকিং করে কিভাবে বুঝবো ভিসাটি সঠিক?
ইন্টারনেটে তথ্য তো আসলো, কিন্তু আপনি কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে আপনার ভিসাটি ১০০% আসল? এটি বোঝার জন্য আপনাকে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যখন আপনি অনলাইনে সার্চ করবেন, তখন যদি আপনার নাম, পাসপোর্ট নম্বর এবং জন্ম তারিখের সাথে সিস্টেমের তথ্যের হুবহু মিল থাকে, তবে বুঝবেন আপনার ভিসাটি বৈধ। আসল ভিসার ক্ষেত্রে সিস্টেম আপনাকে ‘Active’ বা ‘Issued’ স্ট্যাটাস দেখাবে।
এছাড়া ভিসার কপিতে একটি কিউআর কোড (QR Code) থাকে। আপনি আপনার ফোনের স্ক্যানার দিয়ে সেই কোডটি স্ক্যান করলে যদি সরাসরি সরকারি ডাটাবেজের লিংকে নিয়ে যায় এবং সেখানে আপনার তথ্য দেখায়, তবে সেটি আসল ভিসার বড় প্রমাণ। যদি দেখেন অনলাইনে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বা তথ্যে বড় ধরনের গরমিল আছে, তবে দ্রুত আপনার এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করুন। মনে রাখবেন, ভুয়া ভিসা নিয়ে এয়ারপোর্টে গেলে আপনাকে বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
দুবাই ভিসার বিভিন্ন ধরণ ও তথ্যের ছক
নিচে একটি টেবিল দেওয়া হলো যা আপনাকে দুবাইয়ের বিভিন্ন জনপ্রিয় ভিসা এবং সেগুলোর স্থায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা দেবেঃ
| ভিসার ধরণ | মেয়াদের সময়সীমা | কাদের জন্য প্রযোজ্য |
|---|---|---|
| টুরিস্ট ভিসা | ৩০ বা ৬০ দিন | ভ্রমণকারী ও পর্যটকদের জন্য |
| এমপ্লয়মেন্ট ভিসা | ২ বছর (নবায়নযোগ্য) | যারা চাকরি করতে যাচ্ছেন |
| ভিজিট ভিসা | ৯০ দিন পর্যন্ত | আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাওয়ার জন্য |
| গোল্ডেন ভিসা | ৫ বা ১০ বছর | বিনিয়োগকারী ও মেধাবীদের জন্য |
ভিসা চেক করার সময় সাধারণ কিছু ভুল এবং সতর্কতা
আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে ভুল তথ্য দিয়ে ফেলি, যার ফলে ‘Data Not Found’ দেখায়। দুবাই ভিসা চেকিংয়ের সময় পাসপোর্ট নম্বর টাইপ করার সময় শূন্য (0) এবং ইংরেজি বর্ণ ‘O’ এর মধ্যে পার্থক্য খেয়াল করুন। অনেক সময় আমরা এই দুটির মধ্যে ভুল করে ফেলি। এছাড়া পাসপোর্টের মেয়াদের তারিখটি ফরম্যাট অনুযায়ী (দিন/মাস/বছর) সঠিকভাবে লিখুন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওয়েবসাইট। সবসময় সরকারি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (যেমনঃ smartservices.icp.gov.ae) ব্যবহার করবেন। অপরিচিত কোনো থার্ড পার্টি লিংকে আপনার পাসপোর্টের তথ্য দেবেন না, এতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঝুঁকি থাকে। দুবাই সরকার কখনোই ভিসা চেকিংয়ের জন্য আপনার কাছে টাকা চাইবে না, তাই কোনো সাইট যদি টাকা দাবি করে তবে বুঝে নেবেন সেটি ভুয়া।
দুবাই ভিসা চেকিংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ
দুবাই ভিসা চেকিং করার পর যদি দেখেন সবকিছু ঠিক আছে, তবে আপনার পরবর্তী কাজ হলো আপনার ফ্লাইটের টিকিট নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা বিমার কাজ শেষ করা। দুবাই যাওয়ার আগে আপনার ভিসার একটি রঙিন কপি প্রিন্ট করে সাথে রাখুন। ডিজিটাল কপি ফোনে থাকলেও হার্ড কপি সাথে রাখা সবসময় নিরাপদ।
আপনার যদি এখনো কোনো সন্দেহ থাকে বা অনলাইন চেক করতে গিয়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন, তবে অভিজ্ঞ কারো সাহায্য নিন। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কেও আপনি যোগাযোগ করতে পারেন। সঠিক তথ্য জেনে বিদেশ যাওয়া আপনার যাত্রাকে করবে নিরাপদ এবং দুশ্চিন্তামুক্ত।
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তির কল্যাণে এখন জালিয়াতি ধরা অনেক সহজ হয়ে গেছে। সামান্য একটু সচেতনতা আপনাকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে। আশা করি, এই নির্দেশিকাটি আপনার দুবাই যাওয়ার স্বপ্নকে একধাপ এগিয়ে দেবে। আপনার দুবাই যাত্রা আনন্দময় এবং সফল হোক! এই তথ্যগুলো যদি আপনার উপকারে আসে, তবে আপনার বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করতে ভুলবেন না।
আরো জানুনঃ






