মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা। বেতন, খরচ সহ বিস্তারিত

মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা হলো ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রে কোনো বিদেশি নাগরিকের বৈধভাবে চাকরি করার মূল সরকারি অনুমতিপত্র। আপনি যদি সেখানে কাজের উদ্দেশ্যে যেতে চান, তবে কোনো দালালকে লাখ লাখ টাকা দেওয়ার আগে পুরো সরকারি প্রক্রিয়াটি নিজে জেনে নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সঠিক নিয়োগকর্তা খুঁজে নিয়ে চাকরির চুক্তিপত্র ঠিকঠাক করতে পারলে খুব সীমিত সরকারি খরচে নিজেই এই পারমিটের ব্যবস্থা করে নেওয়া সম্ভব।

আমার জানা মতে, দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইমিগ্রেশন বিভাগ তাদের এক্সপ্যাট পোর্টালে কাজের ভিসা সংক্রান্ত নিয়মে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক ভাই ভুয়া নিয়োগপত্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারান। তাই সাম্প্রতিক অফিশিয়াল নীতিমালার আলোকে সাজানো এই পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, যাতে মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা পাওয়ার প্রতিটি ধাপ, আসল খরচ ও বেতনের হিসাব আপনার কাছে একদম পরিষ্কার হয়ে যায়।

মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা কী ও এটি কীভাবে কাজ করে?

সাধারণ কথায়, মালদ্বীপের কোনো নিবন্ধিত কোম্পানি যখন কোনো বিদেশি কর্মীকে সে দেশে এনে কাজ দেওয়ার অনুমতি পায়, সেই আইনি নথিটিই হলো কাজের অনুমতি বা ওয়ার্ক পারমিট। অনেকে ভাবেন টিকিট কেটে সেখানে নেমেই বুঝি কাজ শুরু করা যায়, আসলে বিষয়টা একদমই তেমন নয়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।

প্রথমে মালিকপক্ষকে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় থেকে আপনার নামে একটি প্রাক-অনুমোদন নিতে হয়। এই অনুমতিপত্র পাওয়ার পরই একজন কর্মী দেশটিতে আইনি সুরক্ষায় প্রবেশের সুযোগ পান।

এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল (e-EA) ও মূল ওয়ার্ক ভিসার পার্থক্য

একটা বিষয় জেনে রাখা ভালো, অনেকেই ই-এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল বা ই-ইএ (e-EA) এবং মূল ভিসার মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেন। নিয়োগকর্তা যখন এক্সপ্যাট পোর্টালে আপনার সব কাগজপত্র জমা দেন, তখন সরকার একটি ইলেকট্রনিক অনুমতিপত্র দেয়, যাকে e-EA বলা হয়। এটি মূলত মালদ্বীপে প্রবেশের টিকিট।

আপনি যখন এই কাগজ নিয়ে মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামবেন, তখন আপনাকে সাময়িক প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। এরপর ১৫ থেকে ৩০ দিনের ভেতর মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করে পাসপোর্ট ইমিগ্রেশনে জমা দিতে হবে। ইমিগ্রেশন বিভাগ তখন আপনার পাসপোর্টে পূর্ণাঙ্গ মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা স্ট্যাম্প করে দেবে বা ডিজিটাল ওয়ার্ক কার্ড প্রদান করবে।

কাজের অনুমতি পাওয়ার জন্য শিক্ষাগত ও ভাষাগত যোগ্যতা

দ্বীপরাষ্ট্রটিতে কাজের জন্য কী ধরণের যোগ্যতা লাগবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনি কোন পদে আবেদন করছেন তার ওপর। সাধারণ লেবার, ক্লিনিং বা কনস্ট্রাকশন খাতের জন্য কোনো বড় ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটের দরকার পড়ে না। তবে নিজের স্বাক্ষর করতে পারা এবং সাধারণ নির্দেশ বুঝতে পারার মতো জ্ঞান থাকা দরকার।

অন্যদিকে আপনি যদি ক্যাশিয়ার, হোটেল সার্ভিস, শেফ, ড্রাইভিং বা সুপারভাইজার পদে কাজ করতে চান, তবে নূন্যতম এসএসসি বা এইচএসসি পাসের সার্টিফিকেট চাওয়া হয়। টেকনিক্যাল কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ট্রেডের কাজের অভিজ্ঞতা সনদ থাকলে দ্রুত নিয়োগ পাওয়া যায়।

ভাষার দক্ষতার ক্ষেত্রে

ইংরেজি ভাষাঃ রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও সাধারণ শপের কর্মীদের জন্য বেসিক ইংরেজিতে কথা বলতে পারা প্রায় বাধ্যতামূলক। কাস্টমারদের সাথে যোগাযোগ করতে এই দক্ষতা সরাসরি কাজে দেয়।

ধিভেহি (Dhivehi) ভাষাঃ মালদ্বীপের স্থানীয় ভাষা জানা শুরুতে বাধ্যতামূলক নয়। তবে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যারা স্থানীয় ভাষার সাধারণ কিছু শব্দ ও বাক্য দ্রুত শিখে নিতে পারেন, কর্মক্ষেত্রে তাদের পদোন্নতি এবং বেতন বৃদ্ধির সুযোগ অন্যদের চেয়ে বেশি হয়।

প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ও কাগজপত্রের সম্পূর্ণ চেকলিস্ট

আবেদন প্রক্রিয়ায় সামান্য কাগজের ভুল থাকলে ফাইল বাতিল হতে পারে। তাই এক্সপ্যাট পোর্টালে সাবমিট করার আগেই নিচের সব কাগজপত্র নিখুঁতভাবে গুছিয়ে নেওয়া উচিতঃ

  • পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ১ বছর থাকা নিরাপদ, তবে নূন্যতম ৬ মাসের মেয়াদ থাকতেই হবে এবং অন্তত ২টি ফাঁকা পৃষ্ঠা থাকতে হবে।
  • সম্প্রতি তোলা সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের স্পষ্ট ডিজিটাল পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
  • নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্যাডে মুদ্রিত, পদের নাম, বেতন ও অন্যান্য সুবিধাসহ উভয় পক্ষের সই করা চুক্তিপত্র।
  • সরকার অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে যক্ষ্মা (TB), হেপাটাইটিস-বি, এইচআইভি ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের নেগেটিভ রিপোর্ট।
  • প্রার্থীর নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট থানা বা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নেওয়া অপরাধমুক্ত সনদ।
  • ড্রাইভিং, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বিং বা রিসোর্ট সার্ভিসের মতো দক্ষ কাজের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট যুক্ত করতে হবে।

এক্সপ্যাট (Xpat) পোর্টালে আবেদনের ধাপে ধাপে পদ্ধতি

মালদ্বীপের কাজের অনুমতি প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণ ডিজিটালভাবে পরিচালিত হয়। এখানে কোনো কাগজের ফাইল সরাসরি কোনো অফিসে গিয়ে জমা দিতে হয় না।

১ জন প্রবাসীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্মী নিজে সরাসরি এই পোর্টালে প্রোফাইল খুলতে পারেন না; পুরো কাজটি করতে হয় নিয়োগকারী সংস্থাকে।

কোটা অনুমোদনঃ নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে সরকারের কাছ থেকে বিদেশি কর্মী আনার কোটা নিশ্চিত করতে হয়।

অনলাইন ফাইল সাবমিশনঃ মালিকপক্ষ এক্সপ্যাট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (xpat.egov.mv) লগইন করে কর্মীর পাসপোর্ট কপি, ছবি এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স আপলোড করে।

ই-এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল সংগ্রহঃ মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই শেষ হলে পোর্টাল থেকে কিউআর কোডযুক্ত ই-এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল (e-EA) ডাউনলোড করা হয় এবং তা কর্মীকে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে বিএমইটি স্মার্ট কার্ডঃ এই ই-ইএ কপি নিয়ে বাংলাদেশে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) থেকে ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র বা স্মার্ট কার্ড নিতে হয়।

মালদ্বীপে প্রবেশ ও চূড়ান্ত ভিসাঃ দেশটিতে পৌঁছানোর পর নির্ধারিত ক্লিনিক থেকে প্রি-এন্ট্রি মেডিকেল সম্পন্ন করতে হয়। এরপর ফি পরিশোধ করে ইমিগ্রেশনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিলে মূল মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা পাওয়া যায়।

আসল ভিসা প্রসেসিং ও সরকারি খরচের সঠিক হিসাব

মালদ্বীপে যাওয়ার কথা শুনলেই দালালরা ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দাবি করে বসে। অথচ সরকারের নির্ধারিত ফি কিন্তু খুবই সীমিত। আসল তথ্য হলো, কোম্পানি বৈধ হলে সরকারি ফির সিংহভাগ মালিকপক্ষই বহন করতে বাধ্য থাকে। নিচে অফিশিয়াল নির্ধারিত ফি ও খরচের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলোঃ

ব্যয়ের খাতঅফিশিয়াল সরকারি ফি (MVR)বাংলাদেশী টাকায় আনুমানিক রূপান্তর
ই-এমপ্লয়মেন্ট অনুমোদন ফি (e-EA)৫০ রুফিয়াপ্রায় ৪৫০ টাকা
মাসিক ওয়ার্ক পারমিট ফিপ্রতি মাসে ৩৫০ রুফিয়াপ্রতি মাসে প্রায় ৩,১৫০ টাকা
বার্ষিক কোটা ফিবার্ষিক ২,০০০ রুফিয়াপ্রায় ১৮,০০০ টাকা
মেডিকেল ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়ামবার্ষিক ১,০০০ রুফিয়াপ্রায় ৯,০০০ টাকা
লোকাল মেডিকেল চেকআপ ফি৫০০ – ৭০০ রুফিয়াপ্রায় ৪,৫০০ – ৬,৩০০ টাকা

জরুরি নোটঃ মালদ্বীপে যাওয়ার আগে ফ্লাইটের টিকিট খরচ (সাধারণত ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা) এবং বাংলাদেশের মেডিকেল ও বিএমইটি প্রসেসিং ফি মিলিয়ে খুব বড় কোনো আর্থিক অংক হওয়ার কথা নয়। কোনো এজেন্সি অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা দাবি করলে বুঝবেন সেখানে বড় কোনো প্রতারণার ঝুঁকি রয়েছে।

আবেদন জমা থেকে অনুমোদন পাওয়ার সময়সীমা

কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে মালদ্বীপের সিস্টেমে কাজ বেশ দ্রুত এগোয়। নিয়োগকর্তা পোর্টালে রিকোয়েস্ট সাবমিট করার পর সাধারণত ৫ থেকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ই-এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল চলে আসে। তবে কোম্পানিতে যদি পর্যাপ্ত কোটা না থাকে বা কর্মীর পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে কোনো সমস্যা ধরা পড়ে, তবে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে।

ই-অ্যাপ্রুভাল হাতে পাওয়ার পর বাংলাদেশে মেডিকেল ও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করতে আরও ৩ থেকে ৭ দিন লাগে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সঠিক উপায়ে চেষ্টা করলে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যেই মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা প্রসেস সম্পন্ন করে বিমানে ওঠা সম্ভব।

বিভিন্ন খাতে মাসিক বেতন ও আয়ের বাস্তব চিত্র

মালদ্বীপে আয়ের পরিমাণ কাজের ধরণ এবং কাজের লোকেশনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। রাজধানী মালে সিটির সাধারণ কাজের চেয়ে দূরবর্তী পর্যটন দ্বীপগুলোর রিসোর্টে আয়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো।

লেবার ও ক্লিনিং খাতঃ নির্মাণ শ্রমিক, ক্লিনার বা কৃষি খামারের কাজে সাধারণত মূল বেতন ২৫০ থেকে ৩৫০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৪২,০০০ টাকা)।

ড্রাইভিং ও লজিস্টিকসঃ পিকআপ, ট্যাক্সি বা বোট চালকদের বেতন ৪০০ থেকে ৬০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৮,০০০ থেকে ৭২,০০০ টাকা) পর্যন্ত হতে পারে।

দোকান ও রেস্তোরাঁ কর্মীঃ সুপারশপ সেলসম্যান, ক্যাশিয়ার বা ওয়েটার পদে মাসিক আয় ৩৫০ থেকে ৫০০ ডলারের মতো।

রিসোর্ট খাত বনাম লোকাল আইল্যান্ডে চাকরির সুবিধা

রিসোর্টগুলোতে কাজের পরিবেশ বিশ্বমানের। এখানে বেসিক বেতন ৪০০ থেকে ৬০০ ডলার হলেও প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছ থেকে আসা সার্ভিস চার্জ যোগ হয়। অফ-সিজন বাদে বছরের অধিকাংশ সময়েই এই সার্ভিস চার্জ ৩০০ থেকে ৮০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলে একজন সাধারণ রিসোর্ট কর্মীও প্রতি মাসে অনায়াসে ৮০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘরে তুলতে পারেন। লোকাল আইল্যান্ডে সার্ভিস চার্জ কম হলেও কাজের চাপ রিসোর্টের তুলনায় কিছুটা হালকা থাকে।

দ্বীপরাষ্ট্রটিতে থাকার ব্যবস্থা, খাওয়া ও জীবনযাত্রার খরচ

মালদ্বীপে জীবনযাত্রার ব্যয় অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বেশ চড়া, কারণ সেখানে প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যই আমদানি করতে হয়। যদি আপনার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রিতে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা না দেয়, তবে নিজের খরচে থাকা-খাওয়া চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। রাজধানী মালে বা হুলহুমালের মতো জায়গায় একটি ছোট রুমের শেয়ারিং ভাড়া বাবদই মাসে ১০০ থেকে ১৫০ ডলার চলে যায়। এর সাথে ব্যক্তিগত খাবার খরচ যোগ করলে আরও ১০০ থেকে ১৫০ ডলার লাগবে।

তাই মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা চূড়ান্ত করার আগে অফার লেটারে স্পষ্ট দেখে নিন যে “Accommodation and Food provided by the company” কথাটি লেখা আছে কি না।

স্থানীয় শ্রম আইন ও প্রবাসী কর্মীদের আইনি অধিকার

মালদ্বীপের ২০০৮ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী বিদেশি কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু অধিকার সংরক্ষিত রয়েছে।

কাজের সময়ঃ একজন কর্মীকে দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করানো যাবে।

ওভারটাইম ভাতাঃ নিয়মিত কর্মঘণ্টার বাইরে কাজ করালে কর্মীকে মূল বেতনের অন্তত ১.২৫ গুণ থেকে ১.৫ গুণ হারে ওভারটাইম পরিশোধ করতে হবে।

পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখাঃ আইনত নিয়োগকর্তা কোনো কর্মীর পাসপোর্ট নিজের জিম্মায় আটকে রাখতে পারে না। পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখা কর্মীর আইনি অধিকার।

চুক্তি লঙ্ঘনঃ কোম্পানি সময়মতো বেতন না দিলে বা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে কর্মীরা স্থানীয় ‘লেবার রিলেশনস অথরিটি’ (LRA)-তে গিয়ে সরাসরি অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।

দালালের প্রতারণা এড়াতে করণীয় ও ভিসা যাচাইয়ের উপায়

বর্তমানে মালদ্বীপের ভুয়া ভিসা ও ড্রাফট পেপার তৈরি করে প্রতারণা করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কিছু অসাধু দালাল এডিটিং সফটওয়্যার দিয়ে ভুয়া ই-এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেয়।

প্রতারণা থেকে বাঁচতে নিচের সতর্কতাগুলো মেনে চলুন

কিউআর কোড স্ক্যানঃ আপনার ই-এমপ্লয়মেন্ট পেপারে থাকা QR কোডটি স্মার্টফোন দিয়ে স্ক্যান করুন। এটি আপনাকে সরাসরি মালদ্বীপ সরকারের অফিশিয়াল পোর্টালে নিয়ে যাবে।

অনলাইন স্ট্যাটাস চেকঃ এক্সপ্যাট অনলাইন পোর্টালে গিয়ে অ্যাপ্লিকেশন নম্বর ও পাসপোর্ট নম্বর ইনপুট দিয়ে নিজেই দেখে নিন পারমিটটি বৈধ কি না।

বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া লেনদেন নয়ঃ আপনার পাসপোর্টে বাংলাদেশ সরকারের বৈধ স্মার্ট কার্ড ইস্যু হওয়ার পূর্বে কোনো ব্যক্তিকে পুরো টাকা পরিশোধ করবেন না। বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিদেশ যাওয়াঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনত দণ্ডনীয়।

মালদ্বীপ কাজের ভিসায় যাওয়ার আগে যেসব গোপন নিয়ম জানা জরুরি

সাম্প্রতিক অফিশিয়াল নীতিমালার আলোকে তৈরি এই নির্দেশিকাটি পুরোটা পড়ুন, যাতে মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা সংক্রান্ত সাতটি অতি গুরুত্বপূর্ণ গোপন নিয়ম আপনার নখদর্পণে থাকা

বাংলাদেশিদের জন্য এক লাখ (১,০০,০০০) শ্রম কোটা সীমা সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য

মালদ্বীপের শ্রম আইন (Employment Act) অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে সর্বোচ্চ ১,০০,০০০ (এক লাখ) জনের বেশি অদক্ষ বা সাধারণ শ্রমিক নিয়োগ করার আইনি কোনো সুযোগ নেই। অতীতে বাংলাদেশিদের জন্য এই কোটা পূরণ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে নতুন অদক্ষ কর্মী নেওয়া স্থগিত করা হয়েছিল।

কোটা খালি হওয়া সাপেক্ষে বা বড় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিশেষ অনুমতিতে সীমিত আকারে কর্মী নেওয়া হয়। তবে দক্ষ পেশাজীবী যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শেফ বা রিসোর্ট এক্সিকিউটিভদের ক্ষেত্রে এই ১ লাখের সীমাবদ্ধতা কার্যকর নয়। তাই কোনো দালালকে পাসপোর্ট দেওয়ার আগে আপনার মালিকপক্ষের সিস্টেমে কোটা সচল আছে কি না, তা এক্সপ্যাট পোর্টালে যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

অনথিভুক্ত শ্রমিকদের বৈধকরণ ও অপারেশন কুরঙ্গি

দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে অবৈধ বা অনথিভুক্ত হয়ে পড়া বিদেশি কর্মীদের মূলধারায় ফেরাতে সরকার ‘অপারেশন কুরঙ্গি’ (Operation Kurangi) নামের একটি সমন্বিত প্রোগ্রাম চালু করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ প্রবাসীদের চিহ্নিত করে তাদের বায়োমেট্রিক ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা।

১ জন প্রবাসীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রোগ্রামের আওতায় কর্মীরা নতুন কোনো বৈধ স্পনসর খুঁজে নিয়ে এক্সপ্যাট পোর্টালের মাধ্যমে নিয়মিত হওয়ার আবেদন করতে পারছেন। যারা সরকারের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বৈধ হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করবেন না, তাদের সরাসরি ডিপোর্টেশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হবে এবং পাসপোর্টে স্থায়ী ব্ল্যাকলিস্ট সিল মেরে দেওয়া হচ্ছে।

ডিপোজিট ফি বা ফেরতযোগ্য জামানত

মালদ্বীপ ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিদেশি কর্মীর নামে নিয়োগকর্তাকে একটি নির্দিষ্ট অংকের নিরাপত্তা জামানত বা সিকিউরিটি ডিপোজিট সরকারি কোষাগারে জমা রাখতে হয়। এই জামানতের মূল উদ্দেশ্য হলো কর্মী চুক্তি শেষে দেশে ফিরে যাওয়ার বিমান টিকিটের ব্যয় নিশ্চিত করা।

একটা বিষয় জেনে রাখা ভালো, এই জামানতের পুরো টাকা আইন অনুযায়ী মালিকপক্ষকেই বহন করতে হয়। কর্মী বৈধভাবে দেশে ফিরে গেলে মালিকপক্ষ এই টাকা ফেরত পায়। অনেক অসাধু দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী এই ডিপোজিট ফির ভয় দেখিয়ে নিরীহ কর্মীদের কাছ থেকে বাড়তি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও প্রতারণামূলক।

বাধ্যতামূলক অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার

বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পূর্বে যেকোনো সাধারণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট দিয়ে আবেদন করলে তা সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। মালদ্বীপ ইমিগ্রেশন ও দূতাবাস কর্তৃক স্বীকৃত অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকেই এই পরীক্ষা করাতে হবে।

স্বাস্থ্য পরীক্ষায় মূলত রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে এবং সাধারণ শারীরিক ফিটনেস দেখা হয়। বিশেষ করে যক্ষ্মা (TB), হেপাটাইটিস-বি, এইচআইভি বা অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি থাকলে রিপোর্ট আনফিট আসে। মেডিকেল রিপোর্ট পজিটিভ বা ত্রুটিপূর্ণ হলে এক্সপ্যাট সিস্টেমে ওয়ার্ক পারমিটের পরবর্তী ধাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক হয়ে যায়।

বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে যেসব প্রশ্ন করা হতে পারে

মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশন ডেস্কে প্রতিটি নতুন কর্মীকে প্রাথমিক কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অফিসাররা সাধারণত যাচাই করেন যে আপনার কাছে প্রিন্ট করা বৈধ ই-এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল (e-EA) কপি আছে কি না এবং আপনি কোন কোম্পানিতে যাচ্ছেন।

তারা আপনার নিয়োগকর্তার নাম, কাজের ধরন এবং বিমানবন্দরের বাইরে আপনাকে রিসিভ করতে কোনো প্রতিনিধি এসেছে কি না তা জানতে চাইতে পারেন। কোনো অবস্থাতেই নার্ভাস হওয়া যাবে না। কোম্পানির সঠিক নাম ও নিজের পদের কথা স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারলে অফিসাররা কোনো ঝামেলা ছাড়াই পাসপোর্টে সাময়িক এন্ট্রি স্ট্যাম্প দিয়ে দেন।

পাসপোর্ট ও ভিসা কার্ড ডেলিভারির সময়সীমা

মালদ্বীপে পৌঁছানোর পরই কিন্তু প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না। বিমানবন্দরে নামার পর আপনাকে সাধারণত ১৫ দিনের একটি সাময়িক প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে দেশটির সরকার অনুমোদিত কোনো স্থানীয় ক্লিনিক থেকে পোস্ট-অ্যারাইভাল মেডিকেল চেকআপ সম্পন্ন করতে হবে।

মেডিকেল রিপোর্ট ক্লিয়ার আসার পর নিয়োগকর্তা ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট জমা দেন এবং কর্মীর বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়। সাধারণত বায়োমেট্রিক দেওয়ার ৩ থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে পাসপোর্টে মূল মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা স্ট্যাম্পিং শেষ হয় অথবা ডিজিটাল ওয়ার্ক প্লাস্টিক কার্ড ইস্যু করা হয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি দেশটিতে পৌঁছানোর ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করা আইনি বাধ্যবাধকতা।

রেমিট্যান্স প্রেরণে কর ও আইনি বিষয়

মালদ্বীপে কর্মরত সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকদের আয়ের ওপর ব্যক্তিগত কোনো আয়কর বা ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় না। অতীতে রেমিট্যান্সের ওপর নির্দিষ্ট হারে রেমিট্যান্স ট্যাক্স নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা পরবর্তীতে সাধারণ কর্মীদের জন্য শিথিল করা হয়েছে।

তবে আইনগতভাবে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো দেশটিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ব্যাংক অব মালে (BML) কিংবা সরকার অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ (যেমন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন বা লোকাল রেমিট্যান্স হাউস) এর মাধ্যমে বৈধ পথে টাকা পাঠানো সবচেয়ে নিরাপদ। এতে আপনার কষ্টার্জিত টাকা নিরাপদে দেশে পৌঁছায় এবং বাংলাদেশে সরকারিভাবে ঘোষিত বৈধ রেমিট্যান্স প্রণোদনাও পাওয়া যায়।

মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা সংক্রান্ত FAQ

বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে বিএমইটি (BMET) ক্লিয়ারেন্স কেন জরুরি?

উত্তর: বিএমইটি স্মার্ট কার্ড হলো বাংলাদেশ সরকারের বৈধ বহির্গমন ছাড়পত্র। এটি না থাকলে বাংলাদেশের বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পার হওয়া সম্ভব নয়।

ভিসা প্রসেসের সময় ই-এমপ্লয়মেন্ট পেপার আসল না নকল বুঝবো কীভাবে?

উত্তর: ই-এমপ্লয়মেন্ট পেপারে একটি কিউআর (QR) কোড ও অ্যাপ্লিকেশন নম্বর থাকে। এক্সপ্যাট সিস্টেমে (expat.egov.mv) গিয়ে এই নম্বরটি দিলেই সত্যতা যাচাই করা যায়।

আকস্মিক অসুস্থতায় দেশে ফিরতে হলে বিমানের টিকিট কে দেবে?

উত্তর: চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী এবং হেলথ ইনস্যুরেন্সের শর্ত সাপেক্ষে মালিকপক্ষ বা ডিপোর্টেশন ইন্স্যুরেন্স তহবিল থেকে এই খরচ বহন করা হয়।

ভিসা নবায়ন না করে অতিরিক্ত সময় থাকলে কী শাস্তি হতে পারে?

উত্তর: ভিসার মেয়াদের বাইরে থাকলে দৈনিক ভিত্তিতে জরিমানা দিতে হয় এবং ধরা পড়লে দেশে ফেরত পাঠিয়ে ব্ল্যাকলিস্ট করে দেওয়া হয়।

ওভারটাইম করার সাধারণ নিয়ম ও হার কেমন?

উত্তর: মূল ডিউটির (দৈনিক ৮ ঘণ্টা) অতিরিক্ত সময় কাজ করলে মূল বেতনের দেড় গুণ (১.৫X) হারে ওভারটাইম ভাতা প্রদান করার আইনি বিধান রয়েছে।

শেষ কথাঃ

পরিশেষে বলা যায়, সঠিক উপায়ে আবেদন করলে মালদ্বীপ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা পাওয়া মোটেও কঠিন কিছু নয়। অযথা মধ্যস্বত্বভোগীদের ফাঁদে না পড়ে অফিসিয়াল নিয়মে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আপনার যাত্রা শুভ ও সফল হোক। আপনার জন্য রইল অনেক শুভকামনা।

তথ্য যাচাইয়ের অফিসিয়াল ও নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটসমূহ

মালদ্বীপ ইমিগ্রেশন বিভাগ (Maldives Immigration): কাজের ভিসা, প্রবেশাধিকার ও ইমিগ্রেশন আইন সম্পর্কিত তথ্যের জন্য।

এক্সপ্যাট অনলাইন পোর্টাল (Ministry of Homeland Security and Technology): ই-এমপ্লয়মেন্ট অ্যাপ্রুভাল চেক, ভিসা আবেদন ও কোটা স্ট্যাটাস যাচাইয়ের জন্য।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET, বাংলাদেশ): স্মার্ট কার্ড, সরকারি ক্লিয়ারেন্স ও এজেন্সিগুলোর বৈধতা পরীক্ষার জন্য।

মালদ্বীপ শ্রম সম্পর্ক কর্তৃপক্ষ (Labour Relations Authority – LRA): শ্রম অধিকার, কর্মঘণ্টা ও মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের জন্য।

আরো জানুনঃ

সতর্কবার্তা:

আমাদের ওয়েবসাইটের তথ্যসমূহ কেবল দেশী ও প্রবাসীদের তথ্যগত সহায়তা ও সচেতনতার জন্য প্রকাশিত। আমরা কোনো ভিসা এজেন্সি নই এবং সরাসরি ভিসা প্রদান করি না। ভিসা আবেদনের পূর্বে সবসময় সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা এম্বাসির নির্দেশনা অনুসরণ করুন। যেকোনো আর্থিক লেনদেন নিজ দায়িত্বে করুন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top