ভারত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট কিন্তু অপরূপ সুন্দর দেশ সেশেলস (Seychelles)। ট্যুরিজমের জন্য বিখ্যাত এই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ইদানীং অনেক বাংলাদেশিই কাজের খোঁজে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
কিন্তু ইন্টারনেটে সেশেলস কাজের ভিসা নিয়ে সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো— সেশেলসে সাধারণ কোনো “ওয়ার্ক ভিসা” বলতে কিছু নেই!
তাই দালালের মিষ্টি কথায় ভুলে টাকা দেওয়ার আগে, ২০২৬ সালের লেটেস্ট সরকারি নিয়ম, খরচের আসল হিসাব এবং প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায়গুলো একদম সহজ ভাষায় জেনে নিন।
সেশেলস কাজের ভিসা বা GOP আসলে কী?
সেশেলসে গিয়ে আইনিভাবে কাজ করতে চাইলে বিদেশি নাগরিকদের একটি বিশেষ পারমিট লাগে। সরকারি ভাষায় একে বলা হয় গেইনফুল অকুপেশন পারমিট বা সংক্ষেপে GOP (Gainful Occupation Permit)।
এই GOP হলো আপনার সেখানে কাজ করা এবং বসবাস করার একমাত্র বৈধ অনুমতি। এটি ইস্যু করে সেশেলসের ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট (ICS)।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো কর্মী নিজে থেকে এই পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারেন না। আপনার নিয়োগকর্তা বা মালিককেই আপনার হয়ে সেশেলস সরকারের কাছে এর আবেদন করতে হবে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশিদের জন্য সেশেলসের আইনি অবস্থা
অনেকেই প্রশ্ন করেন সেশেলসে বাংলাদেশিদের ভিসা খোলা নাকি বন্ধ? ২০২৬ সালের সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর সুনির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা (Ban) বা কোটা সিস্টেম নেই।
তবে সেখানে একটি অত্যন্ত কড়া নিয়ম আছে। সেশেলস সরকার তাদের দেশের নাগরিকদের কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়।
তাই কোনো মালিক চাইলেই হুট করে বাংলাদেশ থেকে লোক নিতে পারে না। বিদেশি কর্মী নিতে হলে মালিককে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে, ওই পদের জন্য স্থানীয় কোনো যোগ্য কর্মী পাওয়া যায়নি। এরপরই কেবল তারা বিদেশি কর্মী নেওয়ার সরকারি অনুমোদন পায়।
সবচেয়ে বড় সতর্কতা
বাংলাদেশি কর্মীরা কখনোই “ভিসা খুঁজতে” বা “গিয়ে কাজ জোগাড় করব” ভেবে সেশেলসে যেতে পারবেন না। সেশেলসে পা রাখার আগেই আপনার নামে নির্দিষ্ট কোম্পানির GOP বা কাজের পারমিট রেডি থাকতে হবে।
বাংলাদেশিদের জন্য কোন কোন খাতে কাজের সুযোগ সবচেয়ে বেশি?
সেশেলস সরকার নির্দিষ্ট করে কোনো খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। দেশটির কাজের অনুমোদন দেওয়া হয় সম্পূর্ণ পদের ওপর ভিত্তি করে।সেখানকার অর্থনীতির ওপর নজর রাখলে দেখা যায়, মূলত ৫টি প্রধান খাতে বিদেশি ও বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বেশি নেওয়া হয়:
| কাজের খাত | চাহিদাসম্পন্ন পদ বা কাজের ধরন | বাস্তবতা ও বিশেষ শর্ত |
|---|---|---|
| ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি | হোটেল হাউসকিপিং, কিচেন হেল্পার, কুক, ওয়েটার/ওয়েট্রেস, বারটেন্ডার ও ফ্রন্ট-অফিস | কমিউনিকেশন ও ইংরেজি জানার গুরুত্ব অনেক বেশি। |
| কনস্ট্রাকশন (নির্মাণ খাত) | রাজমিস্ত্রি, রড বাইন্ডার, কাঠমিস্ত্রি, পেইন্টার, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার ও সাধারণ শ্রমিক | শারীরিক সক্ষমতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতার সনদ থাকতে হয়। |
| টেকনিক্যাল ও দক্ষ পেশা | চিফ শেফ, বেকার, মেকানিক, এসি/ফ্রিজ (HVAC) টেকনিশিয়ান | আন্তর্জাতিক মানের ট্রেড সার্টিফিকেট থাকলে দ্রুত অনুমোদন মেলে। |
| রিটেইল, লজিস্টিকস ও ক্লিনিং | দোকানের সেলসম্যান, ওয়্যারহাউস হেল্পার, ড্রাইভার, ক্লিনার ও সিকিউরিটি গার্ড | নির্দিষ্ট কিছু পদের জন্য সরকারি লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। |
| কৃষি ও মৎস্য প্রসেসিং | ফার্ম লেবার, বাগান কর্মী, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ সহকারী | স্থানীয় কোনো শ্রমিক না পাওয়ার প্রমাণ খুব কড়াকড়িভাবে দেখা হয়। |
কারিগরি সনদের কড়া নিয়ম (SQA ভেরিফিকেশন)
সেশেলসে টেকনিক্যাল বা দক্ষ পদে কাজ পেতে হলে শুধু অভিজ্ঞতা থাকলেই চলবে না। আবেদন ফাইলের সাথে আপনার শিক্ষাগত সনদ এবং সিভি (CV) জমা দিতে হয়।
সেখানকার সরকার এগুলোকে তাদের নিজস্ব কোয়ালিফিকেশন বোর্ড (Seychelles Qualifications Authority – SQA) দিয়ে মূল্যায়ন করায়। তাই কোনো ভুয়া সার্টিফিকেট বা অভিজ্ঞতা দেখানোর চেষ্টা করলে আপনার আবেদন শুধু বাতিলই হবে না, কালোতালিকাভুক্ত হতে পারেন।
সেশেলসে ন্যূনতম বেতন, ট্যাক্স ও কাজের সুযোগ-সুবিধা
কাজের ভিসায় যাওয়ার আগে সরকারের নির্ধারিত বেতন ও ট্যাক্সের বাস্তব হিসাবটা জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে:
১. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি (Minimum Wage)
২০২৬ সালের কার্যকর নিয়ম অনুযায়ী, সেশেলসে যেকোনো সাধারণ ফুল-টাইম কাজের জন্য ঘণ্টায় জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হলো ৪০.৯৫ সেশেলিজ রুপি (SCR)। আর ক্যাজুয়াল বা পার্ট-টাইম কাজের ক্ষেত্রে ঘণ্টায় মজুরি ৪৭.১৯ রুপি।
একজন পূর্ণকালীন কর্মীর সাধারণ কর্মঘণ্টা অনুযায়ী মূল বেতনের ফ্লোর দাঁড়ায় মাসিক প্রায় ৭,১০০ সেশেলিজ রুপি (SCR)+। বর্তমান এক্সচেঞ্জ রেট (১ রুপি = প্রায় ৮.৫০-৯ টাকা) অনুযায়ী, বাংলাদেশি টাকায় এটি মাসে প্রায় ৬০,০০০ থেকে ৬৫,০০০ টাকার মতো দাঁড়ায় (ওভারটাইম বাদে)। তবে কাজের পদ, ওভারটাইম এবং চুক্তির শর্তভেদে মূল আয় এর চেয়ে বেশি হতে পারে।
২. বেতনের ওপর ১৫% ইনকাম ট্যাক্স (Income Tax)
সেশেলসের শ্রম আইনে একটি বিশেষ আর্থিক নিয়ম রয়েছে। সেখানে বিদেশি কর্মীদের আয়ের ওপর সরাসরি ১৫% ফ্ল্যাট ইনকাম ট্যাক্স কর্তন করা হয়।
চুক্তিতে সই করার সময় নিয়োগকর্তাকে স্পষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করে নেবেন যে অফার লেটারে উল্লেখিত বেতনটি ‘গ্রস’ (ট্যাক্সসহ) নাকি ‘নেট’ (ট্যাক্স বাদে হাতে পাওয়ার টাকা)। তা না হলে মাস শেষে হাতে টাকা পাওয়ার পর ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।
৩. আবাসন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা মান
সেখানকার আইনে বিদেশি কর্মীদের যেনতেনভাবে নোংরা বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ।
নিয়োগকর্তা যে রুমের ব্যবস্থা করবেন, সেটির জন্য সেশেলসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (Public Health) থেকে লিখিত অনুমোদন থাকতে হয়। এছাড়া কর্মীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হওয়া এবং দৈনিক বিশ্রামের সময় দেওয়া বাধ্যতামূলক।
সেশেলস কাজের ভিসা (GOP) আবেদনের ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
সেশেলসের ভিসা প্রসেস অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। মূলত ৪টি সরকারি ধাপ পার হয়ে একজন কর্মীকে সেশেলসে পৌঁছাতে হয়। দালালরা অনেক সময় এই ধাপগুলো গোপন রেখেই সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে:
ধাপ ১: শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগকর্তার অনুমোদন (Labour Migration Approval)
সেশেলসে কর্মী নেওয়ার প্রথম ধাপ শুরু হয় মালিক বা নিয়োগকর্তার দিক থেকে। মালিককে সেশেলসের পত্রিকায় বা কর্মসংস্থান এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়। স্থানীয় কাউকে না পেলে, মালিক প্রমাণসহ শ্রম মন্ত্রণালয়ে (Ministry of Employment) আবেদন করেন। সব ঠিক থাকলে ৩ থেকে ৯ কর্মদিবসের মধ্যে মালিক বিদেশি কর্মী নেওয়ার ‘Approval Certificate’ পেয়ে যান। কোনো কারণে শ্রম মন্ত্রণালয় মালিকের এই আবেদন প্রত্যাখ্যান (Reject) করলে, নিয়োগকর্তা চাইলে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে পুনরায় আপিল করার সুযোগ পান।
ধাপ ২: ইমিগ্রেশনে GOP পারমিটের আবেদন জমা দেওয়া
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর, মালিককে ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট (ICS)-এ কর্মীর জন্য GOP-এর আবেদন করতে হয়। এই ফাইলের সাথে কর্মীর পাসপোর্ট কপি, ছবি, শিক্ষাগত সনদ (SQA ভেরিফিকেশনসহ) এবং একটি অত্যন্ত জরুরি জিনিস— মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়। ইমিগ্রেশন থেকে এই পারমিটটি বের হতে সাধারণত ১ থেকে ৫ দিন সময় লাগে।
ধাপ ৩: বাংলাদেশ থেকে কর্মীর মেডিকেল ও অন্যান্য কাগজ সংগ্রহ
GOP অনুমোদনের জন্য সেশেলসের ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশ থেকে কিছু অরিজিনাল কাগজ পাঠাতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
- পাসপোর্ট: পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ৬ মাস বা তার বেশি থাকা ভালো।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: বাংলাদেশ পুলিশ থেকে নেওয়া হালনাগাদ (সাম্প্রতিক) পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, যা সাধারণত ৬ মাসের বেশি পুরোনো হওয়া যাবে না।
- মেডিকেল ফিটনেস: সেশেলসের ‘অকুপেশনাল হেলথ’ সেকশনের নির্দিষ্ট ফরমেট অনুযায়ী মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। পাড়ার কোনো সাধারণ ক্লিনিকের টেস্ট সেশেলস ইমিগ্রেশন গ্রহণ করে না।
- বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স (BMET Smart Card): সেশেলস সরকার আপনাকে কাজের পারমিট দিলেও, বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট পার হওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বা বিএমইটি থেকে ‘ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স’ বা স্মার্ট কার্ড করতে হবে। এটি ছাড়া ঢাকার ইমিগ্রেশন পুলিশ আপনাকে কোনোভাবেই ফ্লাই করতে দেবে না।
ধাপ ৪: ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) এবং যাত্রা শুরু
GOP বা কাজের পারমিট হাতে পাওয়ার পর, ফ্লাইটের ১০ দিন আগে সেশেলস সরকারের নির্দিষ্ট পোর্টালে (seychelles.govtas.com) বা ‘Seychelles E-Border’ অ্যাপে ঢুকে একটি ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) নিতে হয়। এটি নিতে বৈধ পাসপোর্ট, সেলফি, ফ্লাইটের টিকিট এবং সেশেলসে থাকার জায়গার প্রমাণ (এক্ষেত্রে কোম্পানির ঠিকানা) আপলোড করতে হয়।
ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট (ICS) কাজ শুরুর অন্তত এক সপ্তাহ আগে ফাইল জমার কথা বললেও, সেশেলসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MFA) গাইডলাইন অনুযায়ী নিরাপদ থাকার জন্য অন্তত ১০ সপ্তাহ আগে আবেদন জমা দেওয়া উচিত। সম্পূর্ণ ফাইল জমা পড়লে ১ থেকে ৫ দিনেই এটি ইস্যু হয়, তবে অসম্পূর্ণ ফাইল সরাসরি বাতিল করা হয়।
সেশেলস ভিসার মোট খরচ: সরকারি ফি বনাম বাজারদর
খরচের ব্যাপারটি সেশেলসের ক্ষেত্রে খুবই পরিষ্কার। সরকারিভাবে এই ভিসার মূল খরচ সাধারণত নিয়োগকর্তা বা মালিকই বহন করেন:
১. সরকারি ফি (যা মূলত নিয়োগকর্তা দেবেন)
| খরচের খাত | ফি বা পরিমাণ | কে বহন করবে? |
|---|---|---|
| GOP প্রসেসিং ফি | ১,০০০ সেশেলিজ রুপি (SCR) | নিয়োগকর্তা বা মালিক |
| মাসিক GOP পারমিট ফি | ৫০০ – ৭০০ রুপি (প্রতি মাস) | নিয়োগকর্তা বা মালিক |
| চুক্তিনামা সত্যায়ন ফি | ৭৫০ রুপি (জনপ্রতি) | নিয়োগকর্তা (কাজের ১ মাসের মধ্যে) |
| ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) ফি | ১০.৯০ ইউরো (স্ট্যান্ডার্ড) | সাধারণত কর্মী বা নিয়োগকর্তা |
*সতর্কতা: ইমিগ্রেশন পোর্টালে মাসিক ফি ৫০০ রুপি বলা থাকলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যে এটি ৭০০ রুপি। টাকা জমার আগে অফিশিয়াল সাইট থেকে লেটেস্ট ‘New GOP List of Fees’ পিডিএফ দেখে নেওয়া বাধ্যতামূলক।
২. বাংলাদেশের বাস্তব বাজারদর ও এজেন্টের খরচ
বাংলাদেশে সরকারিভাবে সেশেলসের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ফিক্সড মাইগ্রেশন খরচ বা প্যাকেজ দর (যেমনটা বিএমইটি নির্ধারণ করে) নেই। এজেন্টরা সাধারণত পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, মেডিকেল, বিএমডিসি (BMDC) ভেরিফিকেশন, টিকিট ও সার্ভিস চার্জের নাম করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।
টাকা বাঁচানোর সেরা লাইফহ্যাক (৫টি ডকুমেন্টস)
এজেন্টকে টাকা দেওয়ার আগে বা ফ্লাইট বুক করার আগে সরাসরি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে নিচের ৫টি বিষয়ের লিখিত প্রমাণ বা কপি বুঝে নিন:
১. শ্রম মন্ত্রণালয়ের অ্যাপ্রুভাল লেটার (Employment Ministry approval)।
২. ইমিগ্রেশনে GOP জমার রিসিট বা মূল অ্যাপ্রুভাল কপি।
৩. আপনার ও মালিকের সই করা ফিক্সড-টার্ম চুক্তিনামা (Fixed-term contract)।
৪. সেশেলস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদিত থাকার জায়গার প্রমাণ (Accommodation approval)।
৫. ফ্লাইটের টিকিট কে দেবে, তার লিখিত চুক্তি। এর একটি কাগজও কম থাকলে এক টাকাও অগ্রিম দেওয়া বা ফ্লাইট বুক করা উচিত নয়।
সেশেলস ভিসা নিয়ে সাধারণ প্রতারণা (Scams) এবং বাঁচার উপায়
সেশেলসে সরাসরি যাওয়ার সুযোগকে পুঁজি করে দালালরা নানাভাবে প্রতারণার জাল বুনছে। টাকা খোয়ানোর আগে নিচের সাধারণ ফাঁদগুলো সম্পর্কে সতর্ক হোন:
১. ভুয়া GOP বা পারমিট লেটার (Fake GOP Letter)
দালালরা অনেক সময় কম্পিউটারে বানানো এডিটেড বা ভুয়া ‘GOP Approved’ লেখা পিডিএফ বা স্ক্রিনশট দেখিয়ে বলে “ভাই, আপনার পারমিট রেডি, টাকা দেন।” বাঁচার উপায়: কখনোই শুধু পিডিএফ দেখে টাকা দেবেন না। সেশেলসের ইমিগ্রেশনে (ICS) ফোন করে বা ইমেইল পাঠিয়ে (+248 4293636 / info@immigration.gov.sc) আপনার পারমিটের আসল স্ট্যাটাস চেক করে নিন।
২. ট্যুরিস্ট ভিসাকে ওয়ার্ক ভিসায় পরিবর্তনের ফাঁদ
এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতারণা। দালাল বলবে, “আগে ট্যুরিস্ট ভিসা বা শুধু ETA (ভ্রমণ অনুমতি) দিয়ে সেশেলসে চলে যান, সেখানে যাওয়ার পর মালিক কাজের ভিসা বানিয়ে নেবে।” বাস্তব সত্য: সেশেলস সরকারের ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, GOP বা কাজের পারমিট হাতে না পেয়ে কাজের উদ্দেশ্যে সেশেলসে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এমন চেষ্টা করলে আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকেই সাথে সাথে ফেরত (Deport) পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
৩. ভুয়া কোম্পানি ও থাকার জায়গার জালিয়াতি
মাঝেমধ্যেই অস্তিত্বহীন কোম্পানি বা ভুয়া হোটেল বুকিংয়ের ঠিকানা দিয়ে দালালরা ETA বা ট্রাভেল পারমিট বের করে ফেলে। বাঁচার উপায়: চুক্তি করার আগে কোম্পানির নাম এবং সেশেলস সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে মালিক যে অনুমোদন (Approval) পেয়েছেন, সেটির কপি দেখতে চান।
৪. পাসপোর্টের জিম্মিদশা
কোনো দালাল বা মালিক যদি দেশে বা সেশেলসে যাওয়ার পর আপনার মূল পাসপোর্ট জমা রাখার দাবি করে, তবে সাবধান হোন। সেশেলস আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট জিম্মি রাখা অবৈধ এবং এটি শ্রমিক শোষণের লক্ষণ।
৫. অতিরিক্ত ইটিএ (ETA) ফি আদায়:
অফিসিয়াল ETA বা ট্রাভেল পারমিট ফি মাত্র ১০.৯০ ইউরো (প্রায় ১,৪০০ টাকা)। কিন্তু দালালরা অনেক সময় একে ‘সেশেলস ভিসা ফি’ বলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।
৬. বেতন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো:
বাংলাদেশে দেখানো চুক্তিনামায় অনেক বেশি বেতন লেখা থাকলেও সেশেলসে পৌঁছানোর পর মালিক কম বেতন বা ক্যাশ টাকা ধরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে। তাই যাওয়ার আগেই নিশ্চিত হোন যে বেতনের হিসাবটি সেশেলসের ন্যূনতম মজুরি আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভিক্টোরিয়া এয়ারপোর্ট (SEZ) থেকে সরাসরি বহিষ্কার বা ডিপোর্ট হওয়ার ঝুঁকি
সেশেলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে (Mahé) নামার পর ইমিগ্রেশন অফিসাররা শুধু আপনার ETA দেখে ঢুকিয়ে দেবেন না। নিচের যেকোনো একটি কারণে আপনাকে সরাসরি বাংলাদেশে ফেরত বা ডিপোর্ট (Deport) করা হতে পারে:
- বৈধ GOP না থাকা: কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন অথচ আগে থেকে অনুমোদিত GOP বা কাজের পারমিট নেই।
- রিটার্ন বা অনওয়ার্ড টিকিট না থাকা: ট্যুরিস্ট হিসেবে গেলে বা ভিজিটর এন্ট্রির ক্ষেত্রে আপনার হাতে অবশ্যই ফেরার টিকিট থাকতে হবে।
- ভুয়া ঠিকানা দেওয়া: ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে যদি প্রমাণিত হয় যে আপনার দেওয়া কোম্পানির ঠিকানা বা হোটেলের ঠিকানা ভুয়া।
- অপর্যাপ্ত ফান্ড (Visitor Entry): ভিজিটর হিসেবে ঢুকলে সেশেলসে থাকার সময় প্রতিদিন ন্যূনতম ১৫০ ইউএস ডলার বা সমতুল্য ফান্ডের প্রমাণ ইমিগ্রেশনকে দেখাতে হয়।
সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো— পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে, শর্ত ভঙ্গ করলে বা ভুয়া কাগজ ধরা পড়লে সেশেলসের ‘ইমিগ্রেশন ডিক্রি ১৯৭৯’-এর সেকশন ২৩(২)(খ) [Section 23(2)(b)] অনুযায়ী আপনাকে ‘Prohibited Immigrant’ (নিষিদ্ধ ব্যক্তি) হিসেবে ঘোষণা করে স্থায়ীভাবে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করা হতে পারে।
বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু স্পেশাল টিপস
- চুক্তির তিন কপি ও এক মাসের ডেডলাইন: সেশেলসে পৌঁছানোর পর আপনার মূল কাজের চুক্তিনামাটি তিন কপি করে নিয়োগের ঠিক এক মাসের মধ্যে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ৭৫০ রুপি ফি দিয়ে সত্যায়িত (Attestation) করাতে হবে। এটি মালিকের দায়িত্ব হলেও আপনাকে নজরে রাখতে হবে, নইলে পারমিট বাতিল হতে পারে।
- দৈনিক ১৫০ ডলার ফান্ডের ফাঁদ: অনেকে ভাবেন ভিজিটর হিসেবে ঢুকে পরে কাজের ভিসা করবেন। কিন্তু ভিজিটর এন্ট্রির ক্ষেত্রে এয়ারপোর্টে প্রতিদিনের খরচের জন্য ন্যূনতম ১৫০ ইউএস ডলার ফান্ড দেখাতে হয়। আগে থেকে কাজের ভিসা (GOP) হাতে থাকলে এই ফান্ড দেখানোর ঝামেলা থাকে না।
- মেডিকেল আনফিট হওয়ার প্রধান কারণ: অনেকেই ভাবেন দেশ থেকে ফিট হয়ে গেলেই কাজ শেষ। বাস্তবে সেশেলসে পৌঁছানোর পর সেখানকার ক্লিনিকে আবার টেস্ট হয়। আপনার রক্তে যদি হেপাটাইটিস বি বা সি (Hepatitis B/C), এইচআইভি (HIV), সিফিলিস থাকে অথবা এক্স-রে রিপোর্টে পুরোনো যক্ষ্মার দাগ (TB Scar) ধরা পড়ে, তবে সেশেলস সরকার সাথে সাথে আনফিট করে দেশে ডিপোর্ট করে দেবে। তাই দেশেই এই টেস্টগুলো ডাবল চেক করে নিন।
FAQs
সেশেলস কাজের ভিসায় যাওয়ার বয়সসীমা কত?
সেশেলসের শ্রম আইন অনুযায়ী, কাজের পারমিট পাওয়ার জন্য কর্মীর ন্যূনতম বয়স অবশ্যই ১৮ বছর হতে হবে। তবে সর্বোচ্চ বয়সের নির্দিষ্ট কোনো আইনি সীমা নেই। সাধারণত শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়োগকর্তারা ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের বেশি পছন্দ করেন।
সেশেলসে যেতে কি শিক্ষাগত যোগ্যতা বা আইইএলটিএস (IELTS) লাগে?
নির্মাণ বা কৃষির মতো সাধারণ কাজের জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা বা IELTS লাগে না। তবে হোটেল, সুপারশপ বা টেকনিক্যাল কাজে গেলে আপনার কারিগরি সনদ থাকতে হবে এবং কাজ চালানোর মতো বেসিক ইংরেজি জানতেই হবে।
বাংলাদেশ থেকে সেশেলস ভিসা প্রসেসিং হতে কতদিন সময় লাগে?
সব কাগজ ঠিক থাকলে প্রসেসিংয়ে খুব একটা সময় লাগে না। মালিকের অনুমোদন পেতে ৩ থেকে ৯ দিন এবং ইমিগ্রেশন থেকে পারমিট (GOP) বের হতে ১ থেকে ৫ দিন লাগে। অর্থাৎ, সঠিক নিয়মে এগোলে এক মাসের মধ্যেই পুরো প্রসেস শেষ হয়ে যায়।
সেশেলসে যাওয়ার পর কি ইচ্ছামতো কোম্পানি বা কাজ বদলানো যায়?
একেবারেই না। আপনার পারমিটটি নির্দিষ্ট একটি কোম্পানি ও নির্দিষ্ট পদের জন্যই দেওয়া হয়। আপনি চাইলেই অন্য কারও অধীনে কাজ করতে পারবেন না। কাজ বা কোম্পানি বদলাতে চাইলে ইমিগ্রেশন থেকে নতুন করে দীর্ঘ প্রসেস পার করে আবার অনুমোদন নিতে হবে।
সেশেলস কাজের ভিসায় গেলে কি স্ত্রী-সন্তান বা পরিবার নেওয়া যায়?
সাধারণ কাজের পারমিটে (GOP) পরিবার বা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে যাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। এটি শুধুমাত্র ওই নির্দিষ্ট কর্মীর জন্যই ইস্যু করা হয়। পরিবার সাথে নিতে হলে ইনভেস্টর বা অনেক উচ্চ পদের স্পেশাল ভিসা লাগে।
সেশেলস থেকে কি ইউরোপের কোনো দেশে যাওয়া সহজ?
দালালরা অনেক সময় মিথ্যা লোভ দেখায় যে সেশেলস থেকে ইউরোপ যাওয়া খুব সোজা। বাস্তবে এর কোনো সত্যতা নেই। সেশেলস ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপরাষ্ট্র, সেখান থেকে আইনি বা বেআইনি কোনোভাবেই ইউরোপে যাওয়ার সরাসরি কোনো সুবিধা নেই।
বাংলাদেশ থেকে সেশেলস যাওয়ার সরাসরি কোনো ফ্লাইট আছে কি?
না, ঢাকা থেকে সেশেলসের ভিক্টোরিয়া এয়ারপোর্টে (SEZ) সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। সাধারণত এমিরেটস (দুবাই হয়ে), কাতার এয়ারওয়েজ (দোহা হয়ে) অথবা শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের (কলম্বো হয়ে) ট্রানজিট ফ্লাইটে সেখানে যেতে হয়।
সেশেলসে বিপদে পড়লে বাংলাদেশিরা কোথায় যোগাযোগ করবেন?
সেশেলসে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো দূতাবাস বা হাইকমিশন নেই। যেকোনো আইনি বা পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যা মূলত মরিশাসে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন তদারকি করে। তাই জরুরি প্রয়োজনে মরিশাস হাইকমিশনেই যোগাযোগ করতে হয়।
অফিশিয়াল রিসোর্স এবং সোর্স অফ ইনফরমেশন
এই আর্টিকেলের যাবতীয় তথ্য সেশেলস সরকারের ইমিগ্রেশন, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং ফরেন অ্যাফেয়ার্সের লেটেস্ট গাইডলাইন থেকে যাচাই করা। তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে নিচের অফিশিয়াল লিংকগুলোতে ক্লিক করুন:
- ইমিগ্রেশন ও GOP-এর তথ্য: Department of Immigration and Civil Status (ICS)
- শ্রমিকের অধিকার ও চুক্তি যাচাই: Ministry of Employment and Social Affairs
- ETA বা ট্রাভেল অথরাইজেশন পোর্টাল: Seychelles Electronic Border System
- ভ্রমণ ও এন্ট্রি গাইডলাইন: Ministry of Foreign Affairs (MFA)
- লেটেস্ট সরকারি ফি-এর তালিকা: ICS Service Fees Schedule
সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত: সেশেলসে পা রাখার আগে আপনার হাতে অবশ্যই মালিক-স্পন্সরড আসল “GOP” থাকতে হবে। ETA বা ট্রাভেল পারমিট শুধু ভ্রমণের অনুমতি দেয়, কাজ করার নয়। মালিকের অনুমোদনের লিখিত প্রমাণ ছাড়া এক টাকাও অগ্রিম দেবেন না।
আরো জানুনঃ
এস্তোনিয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা
সতর্কবার্তা:
আমাদের ওয়েবসাইটের তথ্যসমূহ কেবল দেশী ও প্রবাসীদের তথ্যগত সহায়তা ও সচেতনতার জন্য প্রকাশিত। আমরা কোনো ভিসা এজেন্সি নই এবং সরাসরি ভিসা প্রদান করি না। ভিসা আবেদনের পূর্বে সবসময় সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা এম্বাসির নির্দেশনা অনুসরণ করুন। যেকোনো আর্থিক লেনদেন নিজ দায়িত্বে করুন।

আমি মুরশিদ আলম- পেশায় শিক্ষক ও ইমিগ্রেশন বিষয়ক গবেষক। বিদেশগামী বাংলাদেশী নাগরিকেরা যেন সঠিক, তথ্যভিত্তিক ও প্রতারণামুক্ত তথ্য পেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই visapabo.com-এ নিয়মিত গবেষণাভিত্তিক আর্টিকেল লিখি। আর্টিকেলের তথ্যাবলী বিভিন্ন দেশের অফিশিয়াল ইমিগ্রেশন পোর্টাল থেকে যাচাই করে প্রকাশ করি। তথ্যের কোনো গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আপডেট জেনে নিন অথবা মতামত থাকলে নিচের কমেন্ট বক্সে জানানোর অনুরোধ রইল।
✉ ইমেইলঃ visapabo@gmail.com | 🌐 ওয়েবসাইটঃ visapabo.com


