জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা। বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ নির্দেশিকা

আমাদের দেশের হাজার হাজার দক্ষ কর্মী জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা নিয়ে এখন জর্ডানের বিভিন্ন নামী-দামী গার্মেন্টসে কাজ করছেন। আপনি যদি অল্প খরচে এবং সরকারিভাবে বিদেশ যেতে চান, তবে জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা আপনার জন্য সেরা সুযোগ হতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা জর্ডান যাওয়ার খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। এতে আপনার মনে থাকা সব সংশয় দূর হয়ে যাবে এবং আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা বলতে কি বুঝি?

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা মূলত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের ওয়ার্ক পারমিট যা জর্ডানের টেক্সটাইল এবং পোশাক শিল্পে কাজ করার জন্য দেওয়া হয়। জর্ডানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকায় সেখানে পোশাকের বিশাল চাহিদা রয়েছে।

এই চাহিদা মেটাতে তারা বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে দক্ষ দর্জি বা অপারেটর নিয়োগ দেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ভিসার সিংহভাগ নিয়োগ হয় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল (BOESL) এর মাধ্যমে।

এর মানে হলো, আপনার প্রতারিত হওয়ার ভয় নেই বললেই চলে। আপনি সরাসরি ইন্টারভিউ দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে এই ভিসা পেতে পারেন।

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসার প্রয়োজনীয় নথি বা কাগজপত্র

জর্ডান যাওয়ার জন্য আপনার কিছু জরুরি কাগজপত্র আগে থেকেই গুছিয়ে রাখতে হবে। প্রথমেই আপনার একটি বৈধ পাসপোর্ট প্রয়োজন যার মেয়াদ অন্তত এক বছর থাকতে হবে।

আপনার সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি লাগবে যেখানে ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এছাড়া আপনার জন্ম নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সাথে রাখতে হবে।

যেহেতু এটি একটি টেকনিক্যাল কাজ, তাই আপনার কাজের অভিজ্ঞতার সনদপত্র বা সার্টিফিকেট খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট এবং মেডিকেল ফিটনেস রিপোর্টও এই প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

জর্ডান গার্মেন্টসে কাজের ভিসার যোগ্যতা সমূহ

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসায় যাওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীর বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হয়, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে এটি শিথিল হতে পারে।

সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো আপনার সেলাই বা গার্মেন্টস সংশ্লিষ্ট কাজে দক্ষতা। বিশেষ করে ওভেনে বা নিট কাপড়ের কাজে পারদর্শী কর্মীদের জর্ডানে অনেক বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

শারীরিক সুস্থতা এখানে অত্যন্ত জরুরি কারণ আপনাকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করতে হতে পারে। এছাড়া বাংলা পড়তে ও লিখতে জানা এবং সাধারণ হিসাব বোঝার ক্ষমতা আপনার কাজকে আরও সহজ করে দেবে।

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা পেতে সঠিক নিয়মে আবেদন করার নিয়ম

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসার জন্য আবেদন করা বেশ সহজ যদি আপনি সঠিক ধাপগুলো অনুসরণ করেন। সাধারণত বোয়েসেল তাদের ওয়েবসাইটে বা ফেসবুক পেজে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

বিজ্ঞপ্তি দেখার পর আপনাকে অনলাইনে বা সরাসরি বোয়েসেল অফিসে গিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন করতে হয়। এরপর একটি নির্দিষ্ট দিনে আপনার ব্যবহারিক পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ নেওয়া হয় যেখানে আপনাকে মেশিন চালিয়ে দেখাতে হয়।

ইন্টারভিউতে টিকে গেলে আপনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে এবং মেডিকেল টেস্ট করাতে হবে। সব ঠিক থাকলে কোম্পানি আপনার জন্য ভিসা ইস্যু করবে এবং আপনি ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত হবেন।

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা পেতে মোট খরচের হিসাব

জর্ডান যাওয়ার খরচ অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম, কারণ এখানে বেশিরভাগ খরচ নিয়োগকারী কোম্পানি বহন করে। নিচের টেবিলে একটি আনুমানিক খরচের ধারণা দেওয়া হলোঃ

খরচের খাতআনুমানিক পরিমাণ (টাকা)
সার্ভিস চার্জ (বোয়েসেল)৪২,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা
মেডিকেল ফি৪,০০০ – ৫,০০০ টাকা
ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও স্মার্ট কার্ড১,০০০ – ২,০০০ টাকা
বিমান টিকিটকোম্পানি বহন করে
অন্যান্য আনুষঙ্গিক৫,০০০ – ১০,০০০ টাকা

গার্মেন্টস ভিসা পাওয়ার সহজ যেসব উপায়

জর্ডান যাওয়ার সবথেকে সহজ এবং নিরাপদ উপায় হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে আবেদন করা। কোনো দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি বোয়েসেলের নিয়মিত সার্কুলারগুলো ফলো করুন।

আপনার যদি সেলাই কাজে ভালো দক্ষতা থাকে, তবে ইন্টারভিউতে টেকা আপনার জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। নিজের দক্ষতা বাড়াতে আপনি বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে কোর্স করে নিতে পারেন।

মনে রাখবেন, জর্ডানে দক্ষ অপারেটরদের ডিমান্ড সবচেয়ে বেশি। তাই ইন্টারভিউ বোর্ডে আত্মবিশ্বাসের সাথে মেশিন চালিয়ে দেখাতে পারলে আপনার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ বেড়ে যাবে।

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা পাবেন কত দিনে?

আবেদন করার পর থেকে হাতে ভিসা পাওয়া পর্যন্ত সাধারণত ২ থেকে ৪ মাস সময় লাগতে পারে। ইন্টারভিউতে পাস করার পর আপনার মেডিকেল এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে।

এরপর কোম্পানি আপনার নামে ভিসা ইস্যু করলে সেটি বাংলাদেশে আসতে আরও কিছু দিন সময় নেয়। ভিসা হাতে পাওয়ার পর বিএমইটি (BMET) ক্লিয়ারেন্স এবং স্মার্ট কার্ড পেতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

সবশেষে ফ্লাইটের টিকিট কনফার্ম হলে আপনি জর্ডানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পারবেন। পুরো প্রক্রিয়াটি ধৈর্য ধরে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি কারণ এখানে প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গার্মেন্টস ভিসার সুবিধা ও অসুবিধা

বিদেশে যাওয়ার আগে সেখানকার ভালো এবং মন্দ উভয় দিক সম্পর্কে জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। নিচের টেবিলে জর্ডান প্রবাসের কিছু দিক তুলে ধরা হলোঃ

সুবিধাঅসুবিধা
সরকারিভাবে যাওয়ার সুযোগ ও নিরাপত্তাকাজের চাপ বা টার্গেট বেশি থাকে
থাকা এবং খাওয়ার খরচ কোম্পানি দেয়পরিবারের থেকে দূরে থাকার মানসিক চাপ
ওভারটাইম করে বাড়তি আয়ের সুযোগভাষার প্রাথমিক সমস্যা হতে পারে
উন্নত কাজের পরিবেশ ও আধুনিক মেশিনদীর্ঘ সময় ডিউটি করার ক্লান্তি

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসায় নানা ধরণের কাজ ও বেতন

জর্ডানের গার্মেন্টসগুলোতে বিভিন্ন পজিশনে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। পজিশন অনুযায়ী বেতন এবং সুযোগ-সুবিধার কিছুটা পার্থক্য হয়ে থাকে।

পদের নামমাসিক বেতন (আনুমানিক)অতিরিক্ত সুবিধা
সুইং মেশিন অপারেটর২০,০০০ – ২৫,০০০ টাকাওভারটাইম + থাকা ফ্র
কোয়ালিটি কন্ট্রোলার২৫,০০০ – ৩০,০০০ টাকাবোনাস + চিকিৎসা
আয়রন ম্যান / হেল্পার১৮,০০০ – ২২,০০০ টাকাওভারটাইম সুবিধা
লাইন সুপারভাইজার৩৫,০০০ – ৪৫,০০০ টাকাবার্ষিক ছুটি + বোনাস

ভিসা প্রদান করে এমন কিছু গার্মেন্টসের নাম ও ঠিকানা

জর্ডানে অনেক বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন রয়েছে যেখানে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করছেন। নিচে কয়েকটি জনপ্রিয় কোম্পানির নাম দেওয়া হলো যারা নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ঃ

কোম্পানির নামঅবস্থান (জর্ডান)প্রধান পণ্য
ক্লাসিক ফ্যাশন (Classic Fashion)ইরবিড (Irbid)টি-শার্ট, প্যান্ট
গ্যালাক্সি অ্যাপারেলস (Galaxy Apparels)সাহাব (Sahab)জ্যাকেট ও ওভেন
হাই-টেক টেক্সটাইল (Hi-Tech Textile)আদ-দুলাইল (Ad-Dulayl)স্পোর্টস ওয়্যার
নিডল ক্রাফট (Needle Craft)আল-তাজামুয়াত (Al-Tajamouat)লেডিস আইটেম

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসা প্রসেসিংকারি এজেন্ট

জর্ডান যাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সবসময় সরাসরি বোয়েসেলের মাধ্যমে যাওয়ার পরামর্শ দেই। তবে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সিও মাঝে মাঝে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করে থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশে “বোয়েসেল” (BOESL) ছাড়া আর কোনো বিশ্বস্ত বা অনুমোদিত বড় বেসরকারি এজেন্সি জর্ডান গার্মেন্টস ভিসার জন্য এককভাবে কাজ করে না। তাই কোনো ব্যক্তি বা এজেন্সিকে টাকা দেওয়ার আগে অবশ্যই বিএমইটি (BMET) ডাটাবেস চেক করে নিন।

সরাসরি রাজধানীর ইস্কাটনে অবস্থিত বোয়েসেল অফিসে যোগাযোগ করা আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। কোনো এজেন্ট যদি আপনাকে জর্ডানে অনেক বেশি বেতনের লোভ দেখায়, তবে সতর্ক থাকুন এবং যাচাই করুন।

জর্ডানের গার্মেন্টস ভিসা মেয়াদ বৃদ্ধি/নবায়ন ও খরচ

সাধারণত জর্ডানের ভিসা দুই বছরের জন্য ইস্যু করা হয়। আপনার কাজের পারফরম্যান্স ভালো থাকলে কোম্পানি নিজ উদ্যোগে আপনার ভিসা নবায়ন বা রিনিউ করে দেবে।

ভিসা নবায়নের জন্য আপনার পাসপোর্ট এবং বর্তমান রেসিডেন্স কার্ড বা ‘ইকামা’ প্রয়োজন হবে। সুখবর হলো, ভিসা নবায়নের যাবতীয় খরচ সাধারণত কোম্পানি নিজেই বহন করে থাকে।

আপনার যদি কোনো কারণে কোম্পানি পরিবর্তন করতে হয়, তবে সেটির প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল হতে পারে। তবে একই কোম্পানিতে থাকলে আপনার কোনো বাড়তি টাকা খরচ ছাড়াই ভিসা রিনিউ হয়ে যাবে।

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসায় সেখানকার জীবনযাত্রার ব্যয়

জর্ডান গার্মেন্টস ভিসায় জীবনযাত্রার মান বেশ উন্নত হলেও গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য এটি বেশ সাশ্রয়ী। কারণ অধিকাংশ কোম্পানিই কর্মীদের থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা ফ্রিতে করে থাকে।

ব্যয়ের খাতমাসিক খরচ (জর্ডানি দিনার)মন্তব্য
আবাসন (বাসা ভাড়া)০ দিনারকোম্পানি প্রদান করে
খাবার খরচ৩০ – ৫০ দিনারনিজে রান্না করলে কম হয়
মোবাইল ও ইন্টারনেট১০ – ১৫ দিনারপ্যাকেজ অনুযায়ী ভিন্ন হয়
ব্যক্তিগত কেনাকাটা২০ – ৩০ দিনারআপনার অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে

জর্ডানে আপনি যদি একটু হিসেবি হন, তবে আপনার বেতনের প্রায় ৮০ শতাংশ টাকাই দেশে পাঠাতে পারবেন। সেখানে আমাদের দেশের অনেক খাবারের দোকান এবং বাঙালি কমিউনিটি রয়েছে, তাই একাকীত্ব খুব একটা অনুভব করবেন না। একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন। আপনার ভিসা প্রক্রিয়া সফল হোক, এই কামনা করি।

আরো জানুনঃ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top